Skip to main content

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।


বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্রার জন্য, এবং সেখানে ১৮২১ সালে মারা যান। এরপর ১৮৩৫ সালে এক সন্ন্যাসী বর্ধমানে ফিরে আসেন যাকে দেখে অনেকে প্রতাপচাঁদ বলে চিনতে পারেন। কিন্তু পরানচাঁদ লাঠিয়াল দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেন। এরপর কিছুদিন পর বাঁকুড়া থেকে তাকে আবার গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে আট মাস আটক করে রেখে বিচারে আবার ছয় মাস কারাদন্ড দেওয়া হয়। ছাড়া পাওয়ার পর তিনি সুপ্রিম কোর্টে নালিশ জানালেন এবং বর্ধমানে যারা তাকে চিনতেন তাদের সাথে মামলার কারনে যোগাযোগের জন্য নৌবহর নিয়ে বর্ধমানে যাত্রা করলেন। পথে কালনায় থামলে সামান্য অজুহাতে ম্যাজিস্ট্রেট প্রতাপকে গ্রেপ্তার করেন ও বিনা প্ররোচনায় গুলি চালিয়ে প্রতাপের দলের আঠারো জনকে হত্যা করলেন। প্রতাপকে এবারে বিচারের জন্য পাঠানো হল হুগলিতে। সেখানকার ম্যাজিস্ট্রেট তখন ই এ স্যামুয়েলস, যিনি পূর্বে বর্ধমানে ছিলেন, পরানচাঁদের কাছে তিনি শুনেছিলেন জনৈক কৃষ্ণলাল ব্রহ্মচারী প্রতাপচাঁদ সেজেছেন। এই প্রতাপচাঁদ যে জাল, তাঁর প্রমান সংগ্রহের জন্য তিনি বিভিন্ন ব্যাক্তির কাছে চিঠি লিখতে বসলেন, তার মধ্যে অন্যতম দুটি পরানচাঁদ ও দ্বারকানাথ ঠাকুরকে লেখা। মামলা শুরু হলে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় কলকাতা ও হুগলি জুড়ে। প্রতি শুনানির সময় প্রায় দশ হাজার লোক জমায়েত হত হুগলি কোর্টে, যদিও তাদের সকলের সহানুভূতি ছিল প্রতাপের প্রতি। বর্ধমানের বেশ কিছু রাজকর্মচারী এবং বেশ কিছু সম্ভ্রান্ত ব্যাক্তি যেমন দ্বারকানাথ ঠাকুর এই প্রতাপচাঁদকে জাল বলে পরিচিত করেন। আবার অন্যদিকে প্রতাপকে শনাক্ত করার জন্য যারা সাক্ষ্য দেন তাদের মধ্যে ডেভিড হেয়ারের নাম উল্লেখ্য। এমনকি প্রতাপের এককালীন চিকিৎসক ডাঃ স্কট তার দৈহিক চিহ্নসমূহ বর্ণনা করে তাকে শনাক্ত করেন। যদিও শেষঅব্দি আদালত রায় দিল যে প্রতাপের বিরুদ্ধে বেশিরভাগ অভিযোগ প্রমাণিত, তাই তাকে তিন বছর কারাদন্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হল। প্রতাপচাঁদ অব্যাহতি পেয়ে তিনি আবার আপিল করলেন প্রমান দেওয়ার জন্য। কিন্তু আদালত সে আপিল খারিজ করে কারন ততদিনে প্রমান হয়ে গেছে তিনি জাল প্রতাপচাঁদ। এই ‘জাল’ প্রমান করার মূলে ছিল পরানচাঁদের টাকা। দ্বারকানাথ যে মিথ্যে সাক্ষী দিয়েছিলেন তা সন্দেহ নেই। এই ‘জাল প্রতাপচাঁদ’ হুজুক তখন রীতিমতো সাড়া ফেলেছিল কলকাতার বাঙালি জীবনে। অতঃপর? ‘আরে মশাই, সবাই দেখছি এটা নিয়ে মাতামাতি করছে, তাই আমিও দুই-একটা ছবি শেয়ার করে ফেললাম। এ তো কদিনের গল্প। আজ বাদে কাল এমনিই পুরনো হয়ে যাবে, তখন আর কেউ এতো মাতামাতি করবে না’, হুজুক নিয়ে অকপট উত্তর মিলল এক বাঙালির থেকে। হায় আমার হুজুকে বাঙালি, হায় আমার হুজুকে কলকাতা।      

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...