Skip to main content

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’।
উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু বিদ্যাসাগরের যুদ্ধের সেই শুরু যখন তিনি দেখলেন একে একে রাধাকান্ত দেব, ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন, মুক্তারাম বিদ্যাবাগিশ (যিনি কিনা বিধবা বিবাহের ব্যাবস্থাপত্র নিজে লিখেছিলেন) সকলে এসে দাঁড়ালেন বিরোধী পক্ষ হয়ে। বিরোধীতা আরো চরমে উঠল যখন বিদ্যাসাগর দেখলেন রাত্রে বাড়ি ফেরার পথে ঠনঠনের কালীতলায় লাঠি নিয়ে বেশ কয়েকজন এগিয়ে এসেছিল তাদের উদ্দেশ্য পূরণ করতে। কিন্তু থেমে থাকলেন না তিনি। আবারও দরখাস্ত পাঠালেন ভারতবর্ষীয় ব্যবস্থাপক সভায়। সাক্ষর করলেন তাতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, দ্বারকানাথ মিত্র, অক্ষয়কুমার দত্ত আরো অনেকে। বিরোধী পক্ষের বিপরীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে জিতে গেলেন বিদ্যাসাগর। ১৮৫৬ র ২৬ জুলাই পাশ হয়ে গেল বিধবা বিবাহ আইন। এবার শুরু হল বিধবা পাত্রী ও তার জন্য পাত্র খোঁজা। এর আগে যদিও এ ব্যাপারে অক্লান্ত উদ্যোগ দেখিয়েছিলেন ঢাকার রাজা রাজবল্লভ। ১৮৩৭ এ কলকাতার মতিলাল শীল কুড়ি হাজার টাকার পন ঘোষণা করে ‘ইংলিশম্যান’ কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন পাত্রের জন্য। কিন্তু সফল নয় কেউই। অবশেষে পাওয়া গেল একজনকে। ছেলেটি যশোরের খাটুয়া গ্রাম নিবাসী বিখ্যাত রামধন তর্কবাগীশের পুত্র শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। মদনমোহন তর্কালঙ্কের পর তিনি মুর্শিদাবাদের জজ-পন্ডিতের আসনে প্রতিষ্ঠিত। উপযুক্ত পাত্রীও পাওয়া গেল কালীমতি দেবী। নিবাশ বর্ধমানের পলাশডাঙ্গা গ্রামে। এর আগে চার বছর বয়সে তার বিবাহ হয়েছিল। দুইবছর আগে বিধবা হয়েছেন কালীমতি দেবী। বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হল সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে। বর্তমানে জায়গাটি কৈলাশ বসু স্ট্রিট নামে পরিচিত। বাড়িটির তৎকালীন মালিক ছিলেন রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, প্রেসিডেন্সী কলেজের বাংলা অধ্যাপক। সেদিনের দিকে যদি একটু ফিরে  তাকানো যায়, তাহলে পাত্র এসে উঠেছিলেন বউবাজারে রামগোপাল ঘোষের বাড়িতে। গোধূলি  লগ্নে বিয়ে। বরযাত্রীর অগ্রভাগে বরের পালকির সাথে সাথে চললেন বিদ্যাসাগর মশাই। তাঁর ডাইনে বাঁয়ে দ্বারকানাথ মিত্র, শম্ভুনাথ পণ্ডিত, হরচন্দ্র ঘোষ আরো অনেকে। পথে কোথাও বা মিলছে জয়ধ্বনি, কোথাও বা ব্যাঙ্গ বিদ্রূপ। কিন্তু মোটের উপর সারা কলকাতায় তখন সুকিয়া স্ট্রিট জুড়ে আলোড়ন পড়ে গেছে বাংলার প্রথম বিধবা বিবাহ দেখার জন্য। যথাসময়ে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হল বিবাহ, বাংলা ২৩ অগ্রহায়ণ, ১২৬৩ সাল, রবিবার, আর ইংরেজির ৭ ডিসেম্বর, ১৮৫৬। যদিও আজও সেই বিবাহ বাসরটিকে খুঁজে পেতে চান তাহলে আপনাকে উক্ত রাস্তার ৪৮ এ এবং ৪৮ বি নম্বর আঁটা বাড়িরটির দিকে তাকাতে হবে যেখানে একটি দশ বছরের মলিন মেয়ের মুখে হাসি ফুটেছিল, আর হয়তো বা যুদ্ধে জেতার আনন্দেই হোক বা বিধবাদের দুর্দশা দূর করার কারনেই হোক, চোখের কোনাটা অশ্রুতে চিকচিক করে উঠেছিল এক পণ্ডিত ব্রাহ্মনের যিনি আজীবন দুস্থ আর মেয়েদের কল্যাণের কথা ভেবে ‘দয়ার সাগর’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন।

Comments

জনপ্রিয় লেখা

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...