Skip to main content

প্রথম বাঙালি যাদুকর।


‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে প্রিয়নাথ বোসের এই স্বদেশী সার্কাস যে এক উজ্জ্বল নাম, সেকথাও এখন মানুষের অজানা হয়ে গেছে। আর প্রিয়নাথের সার্কাসের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সুশীলার বাঘের খেলা। ভারতের ইতিহাসের সেইই প্রথম মহিলা যে বাঘের খেলা দেখানোতে ছিল পারদর্শীনি। সেই ‘বোস সার্কাস’-এ যোগ দিলেন গণপতি। সালটা খুব সম্ভবত ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে। সার্কাসের খেলা দেখানোর তালিকায় যুক্ত হল গণপতির ম্যাজিক।  গণপতির বিখ্যাত খেলা ছিল দুটি- ইলিউশন বক্স ও ইলিউশন ট্রি। কিছুকাল যেতেই বোস সার্কাসে গণপতিই হয়ে উঠলেন অন্যতম আকর্ষণ। সার্কাসে তার মাসিক আয় সবার থেকে বেড়ে দাঁড়ালো ৩০০ টাকা। ১৯০৮ সালে বোসের সিঙ্গাপুর সফরের সময়ে তাঁর তাসের ম্যাজিক ও অদৃশ্য হওয়ার ভেল্কি জনপ্রিয়তা পায় বিশ্বের দরবারে। গণপতির আরো একটি খেলা এর সাথে যুক্ত হয়; ‘কংসের কারাগার’। অর্থাৎ স্টেজে একটি নকল কারাগারের মধ্যে গণপতি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তালা বন্দী হয়ে থাকবেন এবং কোনোরকম সাহায্য ও চাবি ছাড়াই বেরিয়ে আসবেন তিনি। যাদুকরের পরিচয় ছাড়াও গণপতি বিখ্যাত হয়েছিলেন ক্লাউনের বেশে মজাদার খেলা দেখানোতে, যেমন ‘পিকলু মণির নাচ’। কিন্তু এরই মধ্যে খ্যাতির শীর্ষে থাকা গণপতিকে ঘিরে সার্কাসের ভেতর অনেক শিল্পীদের মধ্যে ঈর্ষা দেখা দিচ্ছিল। অবশ্য ঈর্ষান্বিত লোকের পাশাপাশি তাঁর অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীও ছিল। তাই এই রেষারেষির মধ্যে না থেকে সার্কাস ছাড়লেন গণপতি। সাথে বোসের সার্কাসের কিছু শিল্পীও যোগ দিল তাঁর সাথে। এদের মধ্যে হিঙগণবালা ছিল সবথেকে জনপ্রিয় যার মূল খেলাই ছিল ব্যালেন্সিং। এরপর শুরু হল গণপতির প্রভাব ও প্রতিপত্তি সারা দেশ জুড়ে। যেখানেই যান, তাঁবু ফেলে শুরু হয়ে যায় গণপতির ভেল্কি। দেশের নানাপ্রান্ত থেকে ডাক আসতে লাগল তাঁর। মূলত তাঁর যাদু দেখানোর দুটি দিক ছিল- এক, লৌকিক আমোদ-প্রমোদ ও দুই, অলৌকিক রহস্যের। গণপতির আশ্চর্য খেলা দেখে অনেকে আসত তাঁর কাছে হাত দেখাতে, গ্রহ শান্তি করাতে, এমনকি রোগ ব্যাধি সারানোর জন্য কবিরাজিও করতে হয়েছে গণপতিকে। দেবদ্বিজেতে খুব ভক্তি ছিল গণপতির। নিয়মিত পুজো করা, মাথায় টিকি রাখা; এসবের সাথে অসাধারণ ম্যাজিক- অনেকের মনে হতে বাধ্য ছিল যে তিনি তন্ত্রের সাধনা করেন ও অনেক অলৌকিক শক্তির অধিকারী। অবশ্য শুধু ম্যাজিক দেখানো নয়, পারদর্শী ছিলেন নাট্যাভিনয়তেও। জীবনের প্রায় ৭০ বছর বয়স অব্দি দেখিয়ে গেছেন তাঁর আশ্চর্য সব ম্যাজিক। বিয়ে করেছিলেন নিজেরই দলের সহকর্মীনি হিঙ্গগণলবালাকে। শেষ জীবনটা সাধন-ভজন করেই কাটিয়েছেন বরাহনগরের নিজের বাড়িতে। সারাজীবনে যা উপার্জন করেছিলেন, তাতেই নিজের বাড়ির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাধামাধবের মন্দির। ১৯৩৯ খ্রিঃ ২০ শে নভেম্বর সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেন গণপতি চক্রবর্তী। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে সেই সময়ে দাঁড়িয়ে যাদুবিদ্যাকেও যে উপার্জন হিসেবে সারাদেশের কাছে উল্লেখযোগ্য নজির ফেলে দেওয়া যায়, সেটাও করে দেখিয়েছিলেন একজন বাঙালি। তিনি যাদুকর গণপতি চক্রবর্তী।                      

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...