Skip to main content

কালীর শহর না কলের শহর?



একটি নাম। তাহার মানে কিংবা উৎপত্তি খুঁজিতে গিয়া মিস্টার বিকজের গলদঘর্ম দশা। নামটি যদিও সামান্য, তদাপি মিসেস হোয়াইয়ের নিকট তিনি কি জবাব দিবেন, সেই ভাবিতে গিয়া তার বড়ই করুণ দশা। তদ্যাপি হইতে ‘কলিকাতা’ নামকরনের উৎসমুখ খোঁজা শুরু। একদা তিনি ভাবিতে ভাবিতে কলিকাতা-কে ঠেলিয়া দিয়াছেন মা কালীর চরণে। ‘কালী’ হইতেই ‘কলিকাতা’, কলিকাতা ‘কালী’র শহর। কিন্তু হিংসার গর্ভে কালীর উৎপত্তির কথা তিনি শুনিয়াছেন। অন্যত্র মিসেস হোয়াইট কলিকাতাকে ভালোবাসার শহর হিসেবে গন্য করেন। তাই বাতিল করিতে হইল এই মতবাদ। মিস্টার বিকজের ন্যায় আরো অনেকের নিকট খুঁজিলে নানা মতবাদ পাওয়া যাইবে কলিকাতা নামের পশ্চাৎ-এ। তথাপি এ শহরের নামের উৎসমুখ খুঁজিতে সকলেই আগ্রহী। কলিকাতা কোনো প্রাচীন শহর নহে, যত না প্রাচীন ঢাকা (প্রায় রোমান আমলের শহর), নদিয়া (তৎকালীন অক্সফোর্ড) অথবা মুর্শিদাবাদ যাহা কিনা তৎকালীন লন্ডন অপেক্ষা সুন্দর নগরী। যদিও পঞ্চম শতকে বিপ্রদাস পিপলাইয়ের ‘মনসামঙ্গল’এ ‘কলিকাতা’র কথা আছে। এছাড়া মুকন্দরামের চন্ডী বা ‘আইন-ই-আকবরি’ তেও আছে। অন্যত্র স্থানীয় জনতা দাবী করেন আদতে কলিকাতা হইল গোবিন্দপুর। জমিদার গোবিন্দ দত্ত ভগবান গোবিন্দের স্বপ্নাদেশে কালীঘাটে মাটি খনন করিয়া টাকা পাইলেন, সেই টাকায় পত্তন করিলেন গোবিন্দপুর। সুতানুটি নিয়েও অনেক বিতর্ক। কেউ বলেন সুতা ও নটির ব্যাবসা হইতে ‘সুতানুটি’ নামকরন। অনেকে বলেন এসব বাজে কথা। বিখ্যাত সাবর্ণ চৌধুরিদের গৃহদেবতা ছিলেন শ্যামরায়। মন্দিরের সমুখেই ছিল এক বিরাট ছত্র, যার নীচ হইতে প্রত্যহ প্রসাদ বিতরন বা লুঠ হইত। সেই হইতে ছত্রলুট, ক্রমে সুতালুটি হইতে সুতানুটি। আবার অনেকের মতবাদে ‘নুটি’ হইল সুতা গুটানোর ক্ষুদ্র বান্ডিল। সেই হইতে ‘সুতানুটি’। গলদঘর্ম ঐতিহাসিকরা আরো একটি মতবাদ তুলিয়া আনিলেন, তাহা হইল ‘খাল কাটা’ হইতে ‘ক্যালকাটা’। তৎকালীন নেটিভরা কলিকাতাকে বর্গী আক্রমনের হইতে বাঁচাইতে একখানি খাল খনন করিয়াছিল। তাহাকে বলা হইত “মারাঠা ডিচ”। সেই হইতে “খাল কাটা”, ক্রমে “ক্যালকাটা”। এই সকল হওয়া সত্ত্বেও অনেক ঐতিহাসিক স্মিত হাসিয়া কহিলেন, ‘কালিকট শহরকে ভুলিও না তোমরা’। কারন পশ্চিম হইতে ইউরোপিয়ানদের প্রথম জাহাজ আসিয়াছিল দক্ষিনের কালিকট বন্দরে। ইংরাজরা সুবিধা পাইল না কালিকটে। চলিয়া আসিল তারা হুগলীতে। তখন দ্রব্যসামগ্রীতে ‘মেড ইন কালিকট’ লেখা থাকিলেই ক্রয় করে সকলে। এই দেখিয়া ইংরাজরা পড়িলেন মহাবিপদে। এইরূপে চলিলে তাহাদের দ্রব্য কেউ ক্রয় করিবে না, কারন তাহাদের দ্রব্যসামগ্রীতে লেখা আছে ‘মেড ইন হুগলী’। কিন্তু ইচ্ছে থাকিলে উপায় হয়। ইংরাজরা বণিকের জাত, বুদ্ধি তাহাদের বরাবরই অন্য ধারায় চলে। রাতারাতি সকল নাম পালটাইয়া লেখা হইল ‘Made in KALKATA ‘। সেই ফাঁকি আর ধরা পড়িল না নেটিভদের বোকা চক্ষে। সেই হইতে ‘ক্যালকাটা’। শেষে মিসেস হোয়াইট বলিলেন, “সো, ক্যালকাটা ইস ক্যালকাটা”। তদ্যাপি মিস্টার বিকজ মাথা চুলকাইয়া বলিলেন, “আই ডোন্ট নো”।

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...