
কলিকাতা শহরের প্রতিষ্ঠার পশ্চাতে ইংরাজদের বহুল অধ্যাবসায় ছিল। কারন বন জঙ্গল পরিনিত, বন্য হিংস্র জন্তু ও ডাকাত অধ্যুষিত গ্রামকে তিলোত্তমা নগরী গড়ে তোলা সহজ ছিল না, যেমন রোম নগরী একদিনে গড়িয়া ওঠে নাই। তদাপি কোনো শহরের প্রতিষ্ঠাতা বলিতে আমরা একজনকেই নির্দেশ করিয়া থাকি। কলিকাতারও সেইরূপ প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জোব চার্নক। যদিও তাহাকে প্রতিষ্ঠাতা অপেক্ষা আবিষ্কর্তা বলাটাই বাঞ্ছনীয়। ইংরাজরা এই বাংলাদেশে পদার্পণ করার সময়ে চার্নক ছিলেন কাশিমবাজার কুঠির একজন সামান্য ‘জুনিয়র মেম্বার’, সামান্য কর্মী। ১৬৮৬ সালে তিনি বদলি হইয়া যান হুগলীর কুঠিতে। এই কুঠি হইতে তাঁর সকল জবাবদিহির দায় মাদ্রাজ কাউন্সিলে। ভাগ্য বিবাদ সাধল চার্নক বিরুদ্ধে, স্থানীয় রাজকর্মচারীদের সহিত ইংরাজ কুঠিয়ালের গোলমাল। হুগলি তছনছ করিয়া তিনি পালাইলেন দক্ষিনের দিকে। কোম্পানিও অপরদিকে যুদ্ধ ঘোষণা করিল মোঘলদের বিরুদ্ধে। চার্নক হুকুম পাইলেন চট্টগ্রাম চলিয়া যাইবার, নতুন করিয়া কুঠি স্থাপনের জন্য। ভাসিতে লাগিলেন গঙ্গায়। ওই বৎসরই তিনি আসিয়া পৌছাইলেন সুতানটির তীরে। কিন্তু সেই স্থানও তাঁর পক্ষে নিরাপদ নয় তখন। আবার তিনি ভাসিয়া পড়িলেন জলে, এই হেতু যে কোনোপ্রকারে বর্ষা কাটিয়া ও কিছু রসদ সংগ্রহ করিয়া পুনরায় সুতানটিতে আসা। ততদিনে হুগলিতে আসিয়াছেন নতুন নবাব- ইব্রাহিম খাঁ। তিনি ৬০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হলেন কোম্পানিকে। সাল ১৬৯০-এর ২৪ এ অগাস্ট। চার্নক ফিরিয়া আসিলেন সুতানটিতে। যদিও তাহার ইচ্ছে ছিল সুতানটির সহিত চট্টগ্রাম, হিজলি ও উলুবেড়িয়ায় প্রতিষ্ঠা স্থাপন। কিন্তু শেষ অব্দি সুতানটিতেই থামিতে হইল। ক্রমে সুতানটিতে তাঁর নির্দেশে তৈরি হইল কুঠিবাড়ি, কোম্পানির সদস্যদের থাকিবার বন্দোবস্ত, যদিও প্রথম কিছুকাল তাহাকে থাকিতে হইত তাঁর নিজস্ব জাহাজে। সওদাগরি হইত গাছতলায়। তৎকালীন বৈঠকখানার একখানি বটগাছের তলে নাকি বসিত চার্নকের কুঠির সওদাগরী। যদিও বেশিকাল সুতানটির সুখ তিনি ভোগ করিতে যাইতে পারেননি। ১৬৯২এর ১০-ই জানুয়ারিতে চার্নক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বর্তমানে কলিকাতার সেন্ট জন গির্জার প্রাঙ্গনে আজও দাঁড়িয়ে তাঁর সমাধি। বলা হয় চার্নকের এই সমাধিই নাকি কলিকাতার মাটতে প্রথম ইস্টক ইমারত।
Comments
Post a Comment