Skip to main content

শহরের পিতামহ

এ কথা অনেকেই বলে থাকেন যে কোলকাতার জনক বা পিতা হলেন জোব চার্নক। সত্যিই যদি তাঁকে কোলকাতার জনক বলা হয়; তবে কোলকাতার পিতামহ হয়তো বলা হবে আর্মেনিয়ানদের। ইংরাজদের সুতানটিতে পদার্পণ করার অনেক আগে আর্মেনিয়ানরা এই কোলকাতায় পা রাখেন, যার প্রমাণ আজকের কোলকাতার আর্মেনিয়ান গির্জার প্রাঙ্গনে শায়িত ১৬৩০ সালে (ইংরাজরা আসার ৩০ বছর আগে) দানশীল সুকিয়া সাহেবের স্ত্রীর কবর, সেই সুকিয়া সাহেব যার নামে আজকের সুকিয়া স্ট্রীট। সন ১৬৯০, সবেমাত্র চার্নক একটু গুছিয়ে বসেছেন সুতানটিতে। এরমধ্যে বাংলার সুবেদার হয়ে এলেন ঔরঙ্গজেবের নাতি আজিম-উস-সান। ইংরাজরা ঠিক করল তাঁর সাথে কথা বলে মুঘলদের সাথে সব পুরনো গোলযোগ মিটিয়ে নিতে। কিন্তু উপযুক্ত লোক পাওয়া গেলো না উস-সানের সাথে কথা বলার জন্য। অবশেষে ইংরাজরা শরণাপন্ন হল আর্মেনিয়ান খোজা ইসরায়েল সারহেদের কাছে, কারন আকবরের আমল থেকে মুঘলদের সাথে আর্মেনিয়ানদের সখ্যতা ভালো। সারহেদ অনেকরকম উপঢৌকন নিয়ে হাজির হলেন উস-সানের দরবারে। খুশি হলেন উস-সান। সুবেদারের মেজাজ দেখে সারহেদ নিবেদন করলেন ইংরাজদের হয়ে তাঁর আর্জি। সাথে সাথে মঞ্জুর হল সে আর্জি। ইংরাজরা পেলো সুতানটি, গোবিন্দপুর ও কোলকাতায় জমিদারির স্বত্ত্ব। সাথে এও অনুমতি পেলো যে প্রয়োজনে তারা কিনে নিতে পারে এই তিনটি গ্রাম। ধীরে ধীরে ১৬৯৮এর ১০-ই নভেম্বর মাত্র ১৩০০ টাকায় কেনা হয়ে গেলো জমিদারি। পত্তন হল কলকাতা মহানগরীর। কিন্তু দিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে ইংরাজরা চক্ষুশূল হয়ে উঠল বাংলার নবাব জাফর খাঁ-র কাছে। তিনি চাইলেন ইংরাজদের যাবতীয় অধিকার নাকচ করে দিতে। ইংরাজরা আবার পড়ল মহাবিপদে। তাদের সেই দুর্দিনে আবার এগিয়ে এলেন আরও একজন আর্মেনিয়ান; খোজা মানুর। ইংরাজদের দূত এগিয়ে চললেন দিল্লীর উদ্দেশ্যে, তাদের সাথে মুঘলদের বিবাদ ভঞ্জন করতে। পথে খোজা মানুর সবরকম ভাবে সাহায্য করলেন। দিল্লী এসে পৌছাল ইংরাজদের দৌত্যবাহিনী- জন সারমন, খোজা সারহেদ, জন গ্রেট ও এডওয়ার্ড স্টিফেন। উদ্দেশ্য বিফল হলো না ইংরাজদের। ফারুখশিয়ারের থেকে তারা লাভ করল এক বহু অভিপ্রেত ফরমান; যাতে লেখা ছিল- ইংরাজদের পূর্বকার সব অধিকার স্বীকার করলেন মাহামান্য নবাব, সাথে কোম্পানিকে অধিকার দিলেন হুগলি নদীর দুইপাড়ে দশ মাইল পর্যন্ত ৩৮টা গ্রাম কিনে নেওয়ায় অধিকার। অর্থাৎ প্রায় গোটা ২৮ পরগণার দায়িত্ব পেল ইংরাজ কোম্পানি। সাথে পেল স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা। অস্বীকার করা যায় না যে আর্মেনিয়ানদের এই সহায়তা না পেলে কোম্পানির এই রাজস্বের চিরস্থায়ী ভিত রাতারাতি গড়ে তোলা ছিল অনেক কঠিন। তাই জোব চার্নককে যদি কোলকাতার জনক বলা হয়, তাহলে সারহেদকে কোলকাতার পিতামহ বলতে অসুবিধে কোথায়?

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...