Skip to main content

কালো বাবুর কালো রাজত্ব!


শহরের মধ্যেই এ যেন আরো এক আজব শহর। কোলকাতা বাল্যকাল থেকেই আজব দুনিয়া দেখতে দেখতে বড় হয়েছে। ছোটো থেকেই তাকে মাথায় তুলেছে নেটিভ থেকে সাহেবরা; তবুও সে যেন ভেতরেই আলাদা; দুটি ভাগ তার- সাহেবপাড়া এবং ব্ল্যাকটাউন। সাহেবপাড়ার কথা না হয় অন্যদিন শোনা যাবে। আজ একটু চোখ রাখা যাক ব্ল্যাকটাউনের দিকে; কোলকাতা, সুতানটি আর গোবিন্দপুরের আদি বাসিন্দাদের দিকে। ট্যাঙ্ক স্কোয়ার ও চৌরঙ্গী তখন সাহেবপাড়া। এইটুকু বাদ দিয়ে বাকি উত্তর কোলকাতা হিসেব করতে গেলে ব্ল্যাকটাউনের মধ্যে পড়ে। ব্ল্যাকটাউনে পাকাবাড়িও যেমন আছে, তেমনই আছে মাটির ও টালির বাড়ি। ব্ল্যাকটাউনের পাকাবাড়ি জুড়ে অন্দরমহল, বৈঠকখানা, খাজাঞ্চিখানা, আস্তাবল। সাহেবরা পাকাবাড়ির মালিকদের খাতির করে বলেন 'বাবু'; কিন্তু তারা অপরিচ্ছন্ন। তাদের টাকা আছে অনেক, কিন্তু তবু তারা কোলকাতার মধ্যে থেকেই আলাদা। কারন বাবু হলেও তারা ব্ল্যাক। ব্ল্যাকটাউনে পায়ে হেঁটে ঘোড়া ছাড়া গতি নেই। গাড়ি, পালকি শহরে সব থাকলেও এখানেই আসবে না কেউই। সরু সরু গলি, রাশি রাশি এলোপাথাড়ি বাড়ি আর জঞ্জাল। আর আছে অগুন্তি ডোবা, গাছপালা। এখানে কেউ সুসভ্য, কেউ আবার বাবু, আবার কেউ বা হত দরিদ্র। এই ছিল কোলকাতার ব্ল্যাকটাউন। অদ্ভুত লোক এখানকার বাসিন্দা। ধোঁয়া এদের মশার ওষুধ। খাদ্যাখাদ্যের বিচার নেই, ভালোমন্দের জ্ঞান নেই। জুয়া ছাড়া অন্য কোনো খেলাধুলা জানে না তারা। তাই বলে ব্ল্যাকটাউন একেবারে এরকম ছিল না। নাহলে সেখানে শত শত ঝাড়লন্ঠন কখনই জ্বলত না। শ্রাদ্ধ হচ্ছে রাজা নবকৃষ্ণদেবের মায়ের; ন লক্ষ টাকা খরচ হবে। সামান্য নিমু মল্লিক তার মায়ের শ্রাদ্ধে খরচ করেছেন তিন লক্ষ টাকা। সেখানে রাজা নয় লক্ষ টাকা খরচ না করলে 'রাজা'র সম্মান থাকবে কি করে! এরকম এলাহি আয়োজন সাহেবপাড়াতেও হয় না, যেমন করেছিলেন বাবু রামদুলাল সরকার তার দুই পুত্রের বিবাহের সময়- হিন্দু থেকে মুঘল সমগ্র লোককে নিমন্ত্রন করে। একেবারে ব্ল্যাক ছিল না এই কোলকাতা। এখানে যাত্রা থেকে কবির লড়াই, বুলবুলির লড়াই, বেড়ালের বিয়ে এসব আমোদও ছিল। তবে ব্ল্যাকটাউনের বাবুদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখ্য ছিলেন কোলকাতার ব্ল্যাক জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র। সরকার থেকেই উপাধি পেয়েছিলেন 'ব্ল্যাক জমিদার'। ১৭২০ সালে কোলকাতায় প্রথম জমিদার নিযুক্ত হলেন তিনি। মাসে মাইনে ৩০ টাকা। ক্রমে কোম্পানিকে তোষামোদ করে মাইনে আরো ২০ টাকা বাড়ালেন। কিন্তূ গোবিন্দরাম জানতেন কুড়িয়ে নিতে জানলে এ-পদে টাকার অভাব নেই। ফলে অচিরেই তার সিন্দুক ভরে উঠল। কিন্তু সবার সুখের দিন সমান যায় না। হলওয়েল ১৭৫২ তে জমিদার নিযুক্ত হলেন কোলকাতায়। গোবিন্দরামকে চেপে ধরলেন সমস্ত হিসেব আদায়ের জন্য। কিন্তু ঘাবড়ালেন না ব্ল্যাক জমিদার। উপরওয়ালা কর্তাদের হাত করে হলওয়েলের সমস্ত হিসেব থেকে নিষ্কৃতি পেলেন তিনি। লোকে বলল এ সবই তার 'ব্ল্যাক মানি'র কাজ। এবার ধর্মকর্ম-এর দিকে মন দিলেন গোবিন্দরাম। রাতারাতি চিৎপুরে মন্দির গড়লেন; ১৬৫ ফুট উঁচু নবরত্ন মন্দির; হলওয়েলের মনুমেন্টের থেকেও উঁচু। চারিদিকে প্রবল ধন্য ধন্য রব পড়ে গেলো ব্ল্যাক টাউনের জন্য' ব্ল্যাক জমিদারের জন্য। কিন্তু ১৭৩৭ সালে প্রবল ঝড়ে গুঁড়িয়ে গেল মন্দির, ভেঙ্গে পড়ল চূড়া। আজকে সেই নবরত্ন মন্দিরের কোনো অংশই বাকি নেই কোলকাতায়। কিন্তু সেই মন্দির কেমন ছিল তার কতকটা ধারনা পাওয়া যাবে দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দির থেকে। রানী রাসমনী দাসী তৎকালীন এই নবরত্ন মন্দিরের আদলেই গড়ে দিয়েছেন এই কালী মন্দির। যদিও মন্দিরের উচ্চতায় গোবিন্দরাম মিত্রই শেষ অব্দি জিতেছিলেন।        

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...