রঙচঙে সাইনবোর্ড, পেতলের মূর্তি
দিয়ে সমৃদ্ধ মন্দির, ধুনোর গন্ধ, তেলের বাতি, আঁকাবাঁকা ঘিঞ্জি গলি। সেই গলির ফাঁকে
কোথাও জুয়ার আড্ডা, কোথাও বা প্রবাদের আফিম বা চরসের ডেরা, অথবা দাঁতের ডাক্তারখানা
বা জুতোর দোকান। এক বাঙালি লেখকই এভাবেই বর্ণনা করেছেন কোলকাতার মধ্যেই তার চিন দেশ
ভ্রমণ। কলকাতার চায়না টাউন কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি বা চিনারা সবাই একসাথে এসে গঙ্গার
ঘাটে এসে নামেনি। মূলত ১৭৭০-৮০ সালের মধ্যে চিনা ও ব্রিটিশদের মধ্যে একটা ব্যাবসায়িক
লেনদেন শুরু হয়, তখন থেকেই পীতবর্ণ চিনাদের সম্বন্ধে একটু একটু করে অবগত হয় গোবিন্দপুর,
সুতানটির মানুষরা। এবং
কোলকাতায় চিন দেশের প্রথম অভিযাত্রী হিসেবে পদার্পণের কৃতিত্ব
সম্ভবত টঙ আছু নামক চিনাম্যানের। তিনিই সম্ভবত সুদূর চিন দেশ থেকে আগত কোলকাতার প্রথম
আগন্তুক। কারণ তার আগে এ তল্লাটে আর কোনো চিনা অভিযাত্রীর কথা কোনো সরকারি কাগজে পাওয়া
যায় না। সময়টা প্রায় অষ্টাদশ শতকের শেষ দিককার কথা। ভাগ্যান্বেষী আছু চিন থেকে এসে
নেমেছিলেন আদি কোলকাতায়। কোলকাতা বললে একেবারে সঠিক বলা হয় না; নেমেছিলেন আসলে বজবজে।
বজবজ জায়গাটা তার পছন্দ হওয়ায় হেস্টিংসের কাছে বিনীত আবেদন করলেন কিছু জমি লাভের জন্য।
হেস্টিংস তাকে দান করলেন ৫৬০ বিঘা জমি। কিন্তু জমির আসল মালিকানা ছিল বর্ধমান রাজার।
শেষে ঠিক হল বার্ষিক ৪৫ টাকা খাজনার বিনিময়ে আছু এই জমি লাভ করবেন। ক্রমে বজবজ থেকে
৬ মাইল দক্ষিন পশ্চিমে আছু তৈরি করলেন তার খামার; বসালেন চিনির কল। কিন্তু কল চালাতে
লোক চাই। কোম্পানির সাথে রফা করে দেশ থেকে ডেকে আনলেন এক জাহাজ চিনা শ্রমিক। ক্রমে
কোলকাতা থেকে দূরে বজবজে প্রথম গড়ে উঠল চিনা উপনিবেশ। টঙ আছুর নামে জায়গার নাম হল
‘আছিপুর’, বর্তমানের বজবজের আছিপুর। ক্রমে এই আছুর দেখানো পথ ধরেই আসতে থাকে আরো অনেক
ভাগ্যান্বেষী চিনা। শুধু বজবজ নয়, আস্তে আস্তে
কোলকাতার টেরিটিবাজার, ট্যাংরা, বউবাজার, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনউ জুড়ে চিনাদের বিস্তার
ঘটল। ফলে আছুর প্রতিদ্বন্দীতা বাড়ল তারই স্বদেশের লোকদের সাথে।
আছু যদিও কোলকাতার এই সকল চিনা সমাজের নাগরিকত্ব নিয়ে দরখাস্ত করেছিলেন গভর্নর জেনারেলের
কাছে। অভিযোগে আছু বলেছিলেন, ‘এইসব চিনারা জাহাজ পলাতক। তারা জীবিকাহীন ভবঘুরে। ঈর্ষাপরাবশ
হয়ে তারা আমার নানা কাজে বাধা সৃষ্টি করছে। আমার লোকেদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে কাজ ছেড়ে
দিতে বলছে’। কিন্তু শেষ অব্দি এই সমস্যার মীমাংসা হয়েছিল কিনা তা কারুর জানা নেই, কিন্তু
শেষ অব্দি আছু হার মেনেছিলেন জীবনের কাছে, মৃত্যুর কাছে। তার মৃত্যুর পর আছিপুরের তার
সমস্ত সম্পত্তি নিলামে ওঠে, সাথে তার সাধের চিনির কলটিও বিক্রি হয়ে যায়। আজকের বজবজের
আছিপুরে আছুর সব স্মৃতি মুছে গেলেও রয়ে গেছে তার প্রতিষ্ঠিত চিনা মন্দিরটি। প্রতি বছর
ফেব্রুয়ারিতে কোলকাতা থেকে সমস্ত চিনারা এখনো সেখানে ছুটে যান কোলকাতায় প্রথম ভাগ্যান্বেষীর
চিনাম্যানকে স্মরন করতে। কারণ কোলকাতায় উপনিবেশের আদিপুরুষের প্রেরণা বলতে তিনিই।

Comments
Post a Comment