Skip to main content

লড়াই করার সহজ উপায়।


‘ডুয়েল’, এই শব্দটার অর্থ দুইভাবে করা যায়। এক ডুয়েলের মানে হল ‘দ্বৈত’, অন্য ডুয়েলের মানে হল ‘দ্বন্দ্বযুদ্ধ’। যদিও ইংরেজি বানানের রকমফের আছে। তবে এখানে যে কথা বলতে বসেছি সেটা হল Duel বা দ্বন্দ্বযুদ্ধ। অষ্টাদশ শতকের কোলকাতায় তখন সবাই লড়িয়ে। লখনৌয়ে তখন কুস্তি কিংবা নিদেনপক্ষে মুরগির লড়াই। উৎকলবাসীদের রাম-রাবনের লড়াই, যদিও সেটা স্টেজে। বাঙালিরা অবশ্য এইসব লড়াই থেকে অনেক দূরে। বাঙালি বাবু সমাজ যদিও লড়াই ভালোবাসেন, কিন্তু তারা মাঠে নামেন না কখনও। তারা লড়াই দেখতে ভালোবাসেন যেমন কিনা কবির লড়াই কিংবা বুলবুলির লড়াই। সাহেবদের কথা অবশ্য আলাদা, তারা পাশ্চাত্যের মানুষ, রক্ত গরম। তাদের তো বুলবুলির লড়াইয়ে স্বাদ মিটবে না। তাই তারা ‘ডুয়েল’ লড়েন; কখনও তলোয়ার নিয়ে, কখনও বা পিস্তলে। ১৭৮০ সালের ১৭-ই অগাস্ট। আজকে আলিপুরে যেখানে ন্যাশেনাল লাইব্রেরী, তার পাশ দিয়ে যে একটা ছোটো রাস্তা চলে গেছে, উক্ত ওই দিনে কোলকাতায় প্রথম ইজ্জতের লড়াই হয়েছিল, ডুয়েল বা দ্বন্দ্বযুদ্ধ। স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস গভর্নর-জেনারেলের পারিষদের প্রথম সারির সদস্য, সাথে বিরোধী দলের শক্তিশালী নেতাও বটে তিনি। ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের সাথে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, প্রতিষ্ঠা, নারীপ্রেম সর্বত্রই তিনি ছিলেন হেস্টিংসের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। হেস্টিংস তাকে ভয় করতেন, সাথে ঘৃণাও। একদিন সেই ঘৃণার উত্তর দিলেন স্যার ফ্রান্সিস,You have left me no alternative but to demand personal satisfaction from you- the affront you have offered me’ । অতঃপর এই জবাবের প্রতিউত্তর না দিলে ইজ্জত থাকে না। শেষ অব্দি হেস্টিংস এসে দাঁড়ালেন বিধিসম্মত ভাবে পিস্তলের ডুয়েল হল দুজনের মধ্যে। কিন্তু শেষ অব্দি কিন্তু জয়ী হলেন হেস্টিংস। ফিলিপ ফ্রান্সিস অবশ্য একটু আহত হয়েছিলেন, কিন্তু ডুয়েলের পরিণতি হিসেবে সাহেব সমাজে তার ইজ্জতের অনেকখানি খোয়া গেছিল। সেদিন কোলকাতা প্রথম যে ইজ্জতের লড়াই দেখেছিল দুই শক্তিশালী সাহেবের মধ্যে, আজকে আলিপুরের সেই রাস্তাটাই ‘ডুয়েল অ্যাভিনিউ’ নামে পরিচিত। এরপরেও কোলকাতায় ইজ্জত বাঁচাতে গিয়ে পিস্তল নিয়ে মাঠে নেমেছে অনেকে। কিন্তু ডুয়েল অ্যাভিনিউয়ের মতো উল্লেখযোগ্য ইজ্জতের লড়াই মনে হয় পুরনো কোলকাতায় অন্যতম ডুয়েল।       

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...