Skip to main content

ডাক্তারের স্বর্গবাস।





নরকরাজ্য! সাক্ষাত যমপুরী। লোক আসে আর মরে, তবুও আসে এখানে। আসার যেমন বিরাম নেই, মরারও তেমনই শেষ নেই। সকালবেলা চাঁদপাল ঘাটে নামা দিব্যি সুস্থ সবল মানুষটার রাত্তিরটা অব্দি কাটল না। কোলকাতা যাত্রায় এখানেই ইতি টানল সে। হ্যাঁ, কোলকাতা ঠিক এমনই ছিল বাল্যকালে। সাহেব থেকে শুরু করে নেটিভদের মনে সর্বদা শঙ্কা; কে যাবে আগে! লোকে এখনও যেমন মরে, তখনও মরত কোলকাতায়। কেউ বা আবহাওয়ার দরুন, আবার কেউ বা ম্যালেরিয়ার, কেউ গেল তো আমাশায়; নেটিভরা যেত না খেতে পেয়ে আর সাহেবরা যেত বেশি খেয়ে। যদিও জাতীয় মহাফেজখানায় সাহেবেদের মধ্যে অধিকাংশ মৃত্যুর খবর আছে কলেরায়। তাই যমপুরী কোলকাতা; অন্য অর্থে ডাক্তারদের কাছে স্বর্গপুরী। কারন সুতানটি, গোবিন্দপুর অঞ্চলের পেশাদার মানুষ বলতে তখন শুধু ডাক্তার আর আইনজীবীরা। বাদ বাকিরা সকলে সরকারি চাকুরে বা ব্যাবসায়ী দোকানি। বুদ্ধিজীবি বলতে তখন বোঝাত ডাক্তারদের। পাশ-করা বিদ্যে নয় তাদের, জন্মসূত্রে পাওয়া শুধু উপস্থিত বুদ্ধিটুকুই তাদের কারবারের ষোলইয়ানা মূলধন। তাতে সার্জন হিসেবেও যা তার খ্যাতি, জেনারেল ফিজিসিয়ান হিসেবেও তেঁতুল গাছের তলায় লম্বা লাইন পড়ত তার কাছেই। ব্ল্যাকটাউনে অবশ্য এসবের বালাই ছিল না। তাদের চিকিৎসা বলতে যা খুশি। কবরেজি, হেকিমি, ঝাড়ফুঁক। দৈবওষুধ, ভালুকের লোম, সাপের চোখ, ধনঞ্জয় পাখির ঠোঁট এসবই ছিল তাদের ভরসা। ১৮৬৪ সালের একটি হাসপাতালে একটি রোগীর চিকিৎসার কথা বিবরণ দেওয়া আছে এই ভাবে- ‘বেলা ১ টায় চিকিৎসা শুরু হইল। ডাক্তাররা কেউ বিলাত ফেরত নহে, সকলে বিলাত-জাত। প্রথমেই এক পাউন্ড রক্ত ফেলিয়া দেওয়া হইল রোগীর দেহ হইতে। বেলা ২ টায় আরো এক পাউন্ড রক্ত। অতঃপর নুন ও তেলের কিছু এক ঘন্ট দেওয়া হইল রোগীকে ঔষধ হিসেবে। এইরূপ প্রথম দিবস অতিবাহিত হইল। পরের দিবসে ঔরূপ চিকিৎসা চালানো হইল। সেই দ্বিপ্রহরে রোগীটি মারা গেল’। আজকের যুগে রোগীটির মৃত্যুর কারন রক্তাল্পতা যদি বলাও হয়, তখনকার কোলকাতায় এটিই ছিল চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষা, এটিই ছিল বিজ্ঞান। ১৭৯৩ সালে ডাক্তাদের যে বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়, তাতে যে সব বক্তব্য ছিল কিঞ্চিৎ এইরূপ- “ডাক্তার চাই। ডাক্তারের আবেদন”। বিজ্ঞাপন পেয়ে ডাক্তার যদিও বা এলেন, কন্ট্রাক্টের চিকিৎসার টাকা তো বটেই, ডাক্তারের তখনকার ফি, সাথে তিনি যে পালকিতে এসেছেন তার বেয়ারার মজুরি- সব খরচার দায়িত্ব রোগীর। ১৭৯৫ সালের ডিন উইডিচ নামে এক ডাক্তার এলেন কোলকাতায়। এসেই বিজ্ঞাপন দিলেন ন্যাচারাল ফিলজফি ও কেমিস্ট্রির উপর বক্তৃতা দেবেন তিনি, ১০ মোহর করে দক্ষিনা। সকলের জন্য দ্বার উন্মুক্ত। যে পারল ছুটল। শহরের অনেক ডাক্তার ছুটলেন সেখানে। ব্যাস, মোটামুটি ২৫ টা বক্তৃতা শোনার পর শুরু হয়ে গেল তাদের প্রাক্টিস। ক্রমে বাড়ল পসার। হয়তো দেখছেন আজকে একজন আপনার নাড়ি ধরে বসে আছে, তিনিই হয়তো গতকাল জাহাজের দড়ি ধরতেন। অবশেষে ১৮৩৫ সালে কেল্লা থেকে তোপ দাগা হল এই সব ডাক্তারদের অস্থায়ী ডাক্তারি বন্ধ করতে। কী ব্যাপার? না, বাঙালির সন্তান মধুসূদন গুপ্ত আর রাজকৃষ্ণ দে আসল মরা কাটলেন মেডিকেল কলেজে, তার কিছু মাস আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে কলেজ। তার কয়েক বছর পর আরোও হইহই কান্ড। চার বাঙালি ছেলে যাচ্ছে বিলেতে ডাক্তারি শিখতে, এবং কেউ শ্বশুরের পয়সায় নপ্য। খরচ যোগালেন সে সময় প্রিন্স দ্বারকানাথ আর ডাঃ গুডিভ ও জনসাধারণ।                     

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...