নাম দেখে যায় চেনা"......কোলকাতাকে যারা খুব ভালো করে চেনেন, তারা সকলেই জানেন যে রাজভবনের উল্টোদিকে একটা গলি আছে যার নাম 'ফ্যান্সি লেন'। 'ফ্যান্সি' কোনো তৎকালীন সুন্দরীর নাম নয়, কিংবা ফ্যান্সি বল বা ফ্যান্সি মার্কেটের স্মারকও নয়। বিশপ হিবারের মতে 'ফ্যান্সি' শব্দটি এসেছে 'ফাঁসি' থেকে। কোলকাতায় যখন কোম্পানির আদি শাসন চলছে তখন অপরাধীদের ফাঁসি দেওয়া হত এখানে। ফ্যান্সি লেন তখন জনপথ নয়, বনাঞ্চল, তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোটো নদী। সে নদীর নাম আজকে কিরনশঙ্কর রায় রোড। কিছুকাল আগে অব্দি এর নাম ছিল হেস্টিং স্ট্রীট। কোলকাতার রাস্তাঘাটের নামকরন ও জন্ম এভাবেই হয়েছে তার বাল্যকাল থেকে। একথা আজকে সকলেরই জানা যে কোলকাতার পূবে লবণহ্রদ ভরাট করে 'সল্টলেক' তৈরি হওয়ায় গল্প। কিন্তু এছাড়াও রয়ে গেছে অতীতের আরো নানান স্মৃতিকথা; যেমন- 'শিয়ালদহ'। একসময় এটি ছিল লবণহ্রদের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক দ্বীপ। সে দ্বীপে বাসিন্দা বলতে তখন ছিল শেয়ালরাজা, কিংবা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। যদিও তখন কোলকাতা জুড়ে বাঘের দৌড়াত্ম্যের কথা পাওয়া যায় ইতিহাসের পাতায়। বেলেঘাটা এলাকাও ছিল এক বালির চর তুল্য অঞ্চল। আর আজকের কোলকাতার হেদুয়ার পুকুর আদতে ছিল হ্রদ। ঠনঠনে ছিল শক্ত মাটির ডাঙা, ঝামাপুকুরে মাটি ছিল তুলনায় আরো শক্ত, ঠুকলে হয়তো আওয়াজ হত ঝনঝন করে। শুধু তাই নয়, স্ট্রীট ডিরেকটরিতে এখনও রয়েছে 'ক্রিক রো'। এককালে নাম ছিল 'ডিঙাভাঙা লেন'। কোনো এক ঝড়ের রাতে একদা সেখানে ডুবে গেছিল কারুর নৌকো। উল্টোডাঙা বলা নিষ্প্রয়োজন, দুর্ঘটনার স্মারক কোনো নৌকোর। এছাড়া কোলকাতার বটতলা, নিমতলা, লেবুতলা, বেলতলা, তালতলা এসব হরেক নামের মধ্যে দিয়ে যেন প্রাচীন কোলকাতার মানচিত্র আজও বেঁচে আছে। বলা হয় এন্টালি নাম এসেছে হিন্তল গাছ থেকে। সাধারণ মানুষের মতো নানা লৌকিক দেব-দেবীও ছড়িয়ে তখন প্রাচীন কোলকাতায়। চৌরঙ্গি, ধর্মতলা, পঞ্চাননতলা, রাধাবাজার, চড়কডাঙ্গা, রথতলা- সবই ঠাকুর দেবতার নামে। বেলগাছিয়ার ওলাইচন্ডি নাকি এখনও মানুষকে রক্ষা করেন কলেরা থেকে। ১৭৫৭র পর কোলকাতার জমিদার হলওয়েল ঠিক করলেন নতুন করে সাজাবেন কোলকাতাকে, যেমন- কুমারটুলিতে কুমোররা, কলুটোলায় কলুরা, দরজিপাড়ায় দরজিরা, যোগীপাড়ায় তাঁতিরা, আহিরিটোলায় বিহার-উত্তরপ্রদেশের আসা গোয়ালারা, খালাসিটোলায় খালাসিরা ইত্যাদি। আজ অবশ্য সে বিন্যাস নেই। খালাসিটোলায় কজনই বা খালাসি থাকেন আজ! এ তো গেলো কে কোথায় থাকবে সে হিসেবে নাম। তেমনই কোন জিনিস কোথায় পাওয়া যাবে সেটাও এলো বাজারের নাম থেকে, যেমন- দরমাহাটা, সবজিহাটা, আমহাটি, সুটাহাটা, পগেয়াপট্টি, চাউলপট্টি। এছাড়া বিখ্যাত ব্যাক্তিদের স্মারকে নামকরনের ইতিহাস নতুন কিছু নয়। যেমন- ব্ল্যাক জমিদার গোবিন্দরাম মিত্রের পাশাপাশি দুটি বাগানবাড়ি ছিল পূর্ব কোলকাতায়, তার নাম এখন জোড়া বাগান। রাজাবাগানে ছিল রাজবল্লভের বাগানবাড়ি। মোহনবাগানের নামে এখন যে সব ফুটবলপ্রেমীরা পাগল, সেখানে নাকি ছিল রাজা গোপীমোহন দেবের বাগানবাড়ি। হাতিবাগানে যেমন ছিল সিরাজদৌল্লার হাতিশালা। কোলকাতার মধ্যে এমন হাজারো নামের ইতিহাসের পেছনে আছে আরো অন্য অনেক ইতিহাস। এক একটা রাস্তার সাথে জড়িয়ে আছে খানসামা থেকে বাবু, গোলাম থেকে সাহেবের কথা। বাকি কথা না হয় অন্যসময়ে বলা যাবে।
‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

অনবদ্য ঋদ্ধি দা
ReplyDeleteঅপেক্ষা থাকল সেই অন্য সময়ের...❤️
ReplyDelete