এ যেন এক হাজার দেশের সমাবেশ। একটা দেশের
মধ্যেই অনেকগুলো দেশ। ইংরেজ, পর্তুগিজ, ফরাসি, গ্রিক, আর্মেনিয়ান- এই সব জাতির হাজারটা
স্মৃতি আপনি খুঁজে পাবেন কোলকাতার বুকে। কিন্তু তার মধ্যে চেষ্টা করলেও খুঁজে পাবেন
না কোলকাতার প্রথম রুশ নাগরিকের স্মৃতি। গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ। তিনি ভারতের
প্রথম রুশ অভিযাত্রী নন, কিন্তু তিনি কোলকাতার প্রথম রুশ নাগরিক। নেশা বলতে শুধু দেশভ্রমন।
১৭৮৫ সালের ১৫ই অগাস্ট তিনি ভিয়েনা, প্যারিস, নেপলস ও লন্ডন হয়ে পাড়ি জমান ভারতে। ভারতের
মাদ্রাজে পৌছে তিনি গোলোকনাথ দাস এক বাঙালির সংস্পর্শে আসেন, যিনিই কিনা পরবর্তীকালে
লেবেদেফের সাফল্যের মূলে ছিলেন। এঁর কাছ থেকেই লেবেদেফ শেখেন সংস্কৃত, বাংলা ও হিন্দি।
দু বছর মাদ্রাজে কাটিয়ে লেবেদেফ চলে আসেন কোলকাতায়, এবং এখানে এসে তিনি শুরু করেন পূর্ব-ভারতীয়
ভাষাতত্ত্বের উপর গবেষণা। কিছুকালের মধ্যে বাংলায় তর্জমা করলেন দুটি ইংরাজি বইয়ের-
“ডিসগাইস” ও “লাভ ইজ দ্য বেস্ট ডক্টর”। শুধু তাই নয়, সেগুলির বাঙালিদের উপযোগী করে
নাট্যরূপ দিলেন তিনি। কিন্তু সমস্যা হল নাটক মঞ্চস্থ করা নিয়ে। তৎকালীন বাংলার গভর্নর
স্যার জন স্টোর তাকে অনুমতি দিলেও, অনুমতি মিলল না ইংরেজ কোম্পানির থেকে, তাদের মঞ্চে
নাটক করার জন্য। তখন গোলোকনাথের চেষ্টায় সংগৃহীত হল ২৫ ডোমতলা রোডের একটা বাড়ি, সংগ্রহ
করলেন বাঙালি অভিনেতা-অভিনেত্রী। ১৭৯৫ সালের ২৭ এ নভেম্বর মঞ্চস্থ হল প্রথম বাংলা নাটক,
বাঙালি অভিনেতা অভিনেত্রীদের নিয়ে। পার্থক্য শুধু নাটক পরিচালক ও নাটক রচনার ক্ষেত্রে।
লেবেদেফ নিজের নাটকের জন্য তৈরি করেছিলেন নিজস্ব গানের দল- অর্কেস্ট্রা। কিন্তু দুই
রাত্রির বেশি নাটক চলেনি তাঁর। বলা ভালো, চলতে দেয়নি ইংরেজ কোম্পানির ষড়যন্ত্র। লেবেদেফের
দলের মধ্যে ঢুকিয়ে কোম্পানি তার নিজের লোক। শোনা যায় শেষ অব্দি নাকি আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল
২৫ ডোমতলা রোডের বাড়িটিতে। সর্বসাকুল্যে ১০ বছর কোলকাতায় ছিলেন লেবেদেফ। ১৮০১ সালেই
প্রকাশিত হয় তাঁর ভাষাতত্ত্বের বই ‘A Grammar of pure and mixed East Indian
Dialects’। কোলকাতার প্রচলিত হিন্দুস্থানি ভাষায় এটিই প্রথম ব্যাকরণের বই। রাশিয়ায়
তিনি ফিরে গিয়ে নিজে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যাতে সারা ইউরোপে প্রথম বাংলায়
হরফ কাটা হয়। এবং সেখান থেকেই প্রকাশিত হয় লেবেদেফের বই- ‘অ্যান ইম্পারশিয়াল কনটেমপেশান
অব দি ইস্ট ইন্ডিয়ান সিস্টেম অব দি বাহমিনস’। রাশিয়ান ভাষায় তিনি প্রথম অনুবাদ করেছিলেন
‘বিদ্যা-সুন্দর’, যার সন্ধান কয়েকবছর আগে পাওয়া গেছে। ১৫০ বছর সেরেস্তাখানায় বস্তাবন্দি
হয়ে থাকার পর এই সাম্প্রতিক আবিষ্কার তাঁর ভারত-প্রেমের অন্যতম সাক্ষ্য হয়ে রইল।
‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

Comments
Post a Comment