Skip to main content

পিতলের পাতের মহিমা।




সামান্য একটা জিনিস। সকাল ৮ টায় আপনি যান সেখানে, দেখবেন তার উপর হয়তো দিনের রুজি-রোজগারের জন্য ফেরিওয়ালাটি বসে পড়েছে, আবার ১০ টায় যান তো দেখবেন ব্যাস্ততম শহরের কয়েকশো লোকের পদচালনা চলছে তার উপর দিয়ে। আবার দুপুর ১টা কিংবা ৩ টেয় যান, কোনো তাবিজওয়ালা দেখবেন তার চারপাশে হরেক লোক জুটিয়ে বক্তিমে দিচ্ছে। যদি ৫ টার বিকেলের পড়ন্ত আলোয় যখন ইস্টার্ন রেলওয়ের বাড়িটির সামনের এই ফুটপাথটা ফাঁকা হয়ে যায়, একমাত্র তখনই আপনার চোখে পড়বে ওই পিতলের পাতটি। ফেয়ারলি প্লেসের এই বাড়িটির সামনের রাস্তায় এই পিতলের পাতটিরও ইতিহাস আছে। কে-ই বা জানে যে একসময় এই বাড়িটির সামনেই ছিল পুরনো ফোর্ট উইলিয়ামের উত্তর পশ্চিমের দেওয়াল। আর ওই পিতলের পাত আজ যে স্থানে, একসময় সেইখান দিয়েই বাংলার নবাব সিরাজদৌল্লা ইংরাজদের হারিয়ে প্রবেশ করেছিলন তাদের কেল্লায়, দর্প চূর্ণ হয়েছিল ড্রেক ও হলওয়েলের। ১৬ই জুন, ১৭৫৬ সাল। হইহই করতে করতে সিরাজ এসে পৌছালেন কোলকাতায়। কোলকাতার যত ইংরাজ সাহেব-মেম বাচ্চা কাচ্চা সহ ভয়ে শহর ছেড়ে আশ্রয় নিল কেল্লায়। তখন কোম্পানির সম্বল বলতে শুধু এই কেল্লা, এই কেল্লাতেই গচ্ছিত তাদের সব সম্পত্তি। ২০ জুলাই ১৭৫৬ সাল, দুপুরের আগেই সিরাজের সৈন্যেরা তোপ দাগল কেল্লার গায়ে। বিকেলের মধ্যেই ধসে পড়ল কেল্লার দেওয়াল, আগুনের ধোঁয়া বেরোতে থাকল কেল্লার থেকে। ১৪৬ জন নারী পুরুষ সহ আত্মসমর্পণ করলেন হলওয়েল। এরপরে সিরাজের কোলকাতাকে আলিনগর করে তোলার কথা সকলেরই জানা। কিন্ত আজও অনেকে জানেন না ডালহৌসি স্কোয়ারে এই লড়াইয়ের কথা। কেল্লার পূর্ব সীমা ছিল নেতাজি সুভাষ রোড, দক্ষিণ সীমা ছিল জেনারেল পোস্ট অফিস। জিপিও-র ভেতরে ঢুকলে আজও দেখা যায় বেশ কিছু খিলান, পুরনো কেল্লার স্মৃতি হিসেবে কিছু আজও বর্তমান। কেল্লার উত্তর সীমার গায়েই ছিল কেল্লার বিরাট ঘাট, নদী তখন স্ট্র্যান্ড রোডের ওপারে নয়, এপারে। আর সেই ঘাটই লোকমুখে প্রথমে ‘কিলা ঘাট’ থেকে আজকের ‘কয়লা ঘাট’-এ নামান্তরিত হয়েছে।         

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...