সমাজে একদল মানুষ দেখবেন যাদের দিনলিপিটা শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষার সাথে কিন্তু একই
থেকে যায়ঃ সকালে উঠে দুধ চা খাওয়া, তারপর মাসের প্রথম সপ্তাহে থলি নিয়ে বাজারে
যাওয়া কিংবা মুদি দোকান থেকে ফেরা, ফেরার পথে ক্ষনেক আড্ডা, সে আড্ডায় রাজনীতি
থেকে অর্থনীতি থেকে বেদ-পুরান; বাঙালী জানে না এমন কিছু নেই। তারপর স্নান সেরে
চাট্টি ভাত খেয়ে আপিস, সেখানে একটু কাজ, একটু ফাঁকি দিয়ে ঘরে ফেরা। ঠিকই ধরেছেন,
এরা সমাজের কেরানি-র জাত নামেই পরিচিত। নিজেদের অবশ্য একটু পদমর্যাদা দিতে ‘রাইটার’
বলে থাকেন; সে আপার ডিভিসন-ই হোক বা লোয়ার ডিভিসন। কোলকাতার বাল্যকাল থেকে এই
রাইটার-দের আগমন শুরু। তখন অবশ্য রাইটার মানে এলাহী ব্যাপার। ইংল্যান্ড থেকে আসা
তরুন রাইটাররা কোলকাতাতে নামলেই তাদের নবাবী জীবনযাপন শুরু। নিজস্ব বাংলো বাড়ি
তাদের জন্য তৈরি, সঙ্গে ৬য় জন করে চাকর, বাবুর্চি। দশ বছরের মধ্যে রাইটার পদ থেকে
প্রোমোশন পেয়ে একেবারে সিনিয়র মার্চেন্ট-এ পরিণত হওয়া যায় তখন। কোম্পানি দেখল এতে
মহা মুশকিল। এরকম করে চললে কোম্পানি খরচের দায়ে লাটে উঠবে। তখন তারা লালদীঘির
ধারের একটা খাস জমিকে পাট্টা দিল জনৈক টমাস লিয়নকে। ১৭৭৬ সালের ১৮ই নভেম্বর লিয়ন
জমিটা হাতে পেলেন। তৈরি হল তার উপর রাইটারদের নতুন বাসভবন; আজকের রাইটার্স বিল্ডিং
বা মহাকরণ। নিয়ম হয়ে গেলো মাসিক ৩০০ টাকার কম যাদের মাইনে, তাদের এসে থাকতে হবে এই
রাইটার্স বিল্ডিং-এ। রাইটার্স বিল্ডিং মানে তখন রাইটার্স-দের কাছে ওয়ান রুম ফ্ল্যাট
নয়। এক একখানা ফ্ল্যাট মানে এক একখানা বাড়ির সমান। তাতেও বিলাসিতা কমল না তরুন
রাইটার-দের। তাদের নিজস্ব বাগান বাড়ি থেকে চাকর-বাকর, গাড়ি-বরকন্দাজ সবই থাকত
কোম্পানির মাইনেতে। কোম্পানি আবার প্রমাদ গুনল তাদের খরচের বহর দেখে। আবার নিয়ম
করলে তাদের জন্য, যেমন- কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কেউ বাগান বাড়ি রাখতে পারবে না,
একজন রাইটার দুজনের বেশি চাকর রাখতে পারবে না ইত্যাদি। তাতে কিন্তু ভাবিত হলেন না
রাইটাররা। কারন তারা জানেন তখন প্রোমোশান মানে লিফট, সিঁড়ি নয়। আজকে যে আন্ডার রাইটার
আছে, তারা কাল হবে রাইটার। এইভাবে ফ্যাকটর, তারপর জুনিয়র মার্চেন্ট, তারপর সিনিয়র
মার্চেন্ট। ১২-১৮ বছর এই চাকরিতে ঢের। মিঃ কোচর্যানের কথা বলি; ১৭৬৯ সালে
কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে এলেন। পদ- রাইটার। ১৭৭৬ এ হলেন ফ্যাক্টর, ৭৮-এ হলেন জুনিয়র
মার্চেন্ট, ৮০-তে সিনিয়র মার্চেন্ট। ব্যাস, চাকরি শেষ করে হয়ে গেলেন তিনি
পুরোদস্তুর ব্যাবসায়ী। সৈন্যবাহিনীতে মদ সরবরাহ হল তাঁর কাজ। ১৮০৮ এ যখন দেশে
ফিরলেন, তখন তাঁর পকেটে ৪০,০০০ পাউন্ড। স্বদেশে তিনি তখন ‘নাবব’। এই হঠাত বড়োমানুষদের
অর্থাৎ ইন্ডিয়া ফেরত রাইটারদের তখন ওদেশে বলা হত ‘নাবব’ (Nabob)। আজকের
রাইটার-দের মতো নবাব হওয়ার স্বপ্ন শুধু তারা দেখত না, তারা সেটাই হয়ে দেখাত ধাপে
ধাপে। সিনিয়র মার্চেন্ট হওয়ার পর সকলে দেশে ফিরে যেত পকেটে কয়েক লক্ষ পাউন্ড নিয়ে।
দেশে ফিরে সেই ক্যাপিটালে নতুন ব্যাবসা কিংবা বাকি জীবনের মতো অবসর। আমাদের ছিদাম
লেনের রাইটাররা শুধু স্বপ্নই দেখে গেলো কয়েক লক্ষ পাউন্ডের। নবাব হওয়া তো দূর,
যুদ্ধের পর যে সেই তারা বেকার হয়েছিল, তারপর তাদের অনেকে কেরানি-ই হতে পারল না
সারাজীবন।
‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

Comments
Post a Comment