
"খোকা ঘুমাল, পাড়া জুড়াল, বর্গী এল দেশে"...সারাদিন খাটুনির পর গভীর রাতে দুরন্ত ছেলেটাকে যে বর্গীর ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াতে হত কেরানি গিন্নি কিংবা মুদি বৌ-কে, সেই বঙ্গে বর্গী সত্যিই এসেছিল। ১৭৪২ সাল, ঘোড়ার খুরে নাগপুর পাহাড়ী অঞ্চল কাঁপিয়ে বীরভূম-বিষ্ণুপুর পেরিয়ে, উড়িষ্যা পার করে বাংলায় পৌছাল বর্গীরা, হাওড়ার শিবপুরে এসে থামল তারা। কোলকাতায় নেটিভদের মধ্যে তখন ছড়িয়েছে আতঙ্ক, কয়েক মাইলের মধ্যে রয়েছে বর্গীরা। নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য নূন্যতম সহায়তাটুকু নেই তাদের। অগত্যার গতি তারা সাহায্য চাইল কোম্পানির কাছে। এদিকে কোম্পানিরও একই দুর্গতি; আত্মরক্ষার জন্য ব্যাবস্থা বলতে লালদিঘীর কোণে একখানা দুর্গ। এদিকে নেটিভরা তাদের ভরসায় কান পেতে বসে আছেন। কোম্পানি নিজেদের হাল বুঝতে পারে যে তাদের জিম্মায় যা সৈন্য আছে, তাতে বর্গী আক্রমন ঠেকানো তাদের সাধ্য নয়। তাই নেটিভদের তুষ্ট করতে কোম্পানি বাগবাজারের ঘাটে দাঁড় করিয়ে দিল একখানি জাহাজ; 'টাইগ্রিস'। পেরিন্স পয়েন্টে জাহাজ দাঁড়াল আরএকখানা, আর জায়গায় জায়গায় বসানো হল গুটিকতক কামান। আর কি ব্যাবস্থা নেওয়া যায় ভাবতে বসল কোম্পানি। এবার নেটিভ-রাগ চড়ে গেলো গোবিন্দপুর সুতানটির মানুষদের মাথায়। স্থির হল, "আমরাই রক্ষা করব"। শুরু হল কিছু সাহস, কিছু শঙ্কা মনে খাদ কাটা, শহর ঘিরে। খাদ বলতে ডিচ। ৪২ গজ চওড়া ৭ মাইল লম্বা। বাগবাজার থেকে শুরু করে বৃত্তের মতো উত্তর থেকে পূব হয়ে ঘুরে দক্ষিণ অব্দি তার বিস্তার। খরচপত্র যা লাগবে সব নিজেরাই চাঁদা তুলে সংগ্রহ করল কোলকাতার মানুষ। কোম্পানিও দিল কিছু আগাম টাকা, ধার হিসেবে। ঠিক হল জনসাধারন পরে পরিশোধ করবে। ছয়মাস কেটে গেলো, এদিকে অবিরাম চলছে খাদ কাটার কাজ। অবশেষে খবর এল মারাঠিদের সাথে বোঝাপড়া হয়ে গেছে নবাবদের। বর্গীরা ফিরে গেলে নিজের দেশে। নেটিভরদেরও খাদ খনন বন্ধ হল। তাতেও বাগবাজার থেকে জানবাজার স্ট্রীট অব্দি খাদ বিস্তার করে গেছে। অনেকে বলেন 'টালির নালা'র অপভ্রংশ ওটা। যদিও সেটা বাগবাজার থেকে পূবে না গিয়ে গেছিল হালসিবাগানে গোবিন্দ মিত্তির ও উমিচাঁদের বাগানবাড়ির দিকে। যাইহোক বর্গী আক্রমন তো হল না। তাহলে খাদ নিয়ে কি করা যায়, ভাবতে বসল কোম্পানি। ভাবতে ভাবতে কেটে গেলো ষাট বছর। মাঝখান থেকে কোলকাতার নাম হয়ে গেল 'ডিচার'। শেষে লর্ড ওয়েলেসলির নির্দেশে এই মরা খাদের উপর তৈরি হল রাস্তা। জন্ম নিল বাগবাজারের মারাঠা ডিচ লেন আর আপার সার্কুলার রোড এবং লোয়ার সার্কুলার রোড।
Comments
Post a Comment