Skip to main content

কোলকাতার অক্সফোর্ড।



সূর্য উঠতে তখনও এক ঘন্টা দেরী। স্নান, পোশাক পরিবর্তন করে প্রাতরাশ। তারপর পণ্ডিত রামলোচনের কাছে সংস্কৃত শিক্ষাগ্রহণ।বেলা বাড়লে প্রতিদিন তিন মাইল পথ পায়ে হেঁটে আসেন কেল্লার সামনে। সেখান থেকে পালকি নিয়ে এসে পৌঁছান কোর্ট হাউসের সামনে। প্রতিদিনের এই একই ধরাবাঁধা নিয়ম গার্ডেনরিচের এই সাহেবটির। কাজে ছুটি পেলে পালিয়ে যান নবদ্বীপে কিংবা নদীয়ায়; পুঁথির খোঁজে। নবগঠিত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক স্যার উইলিয়াম জোন্সের রোজনামচা শুনলে বোঝা দায় যে অক্সফোর্ড ছাত্রজীবনের কৃতিত্বে তিনি লন্ডনের রিতিমতো একটা সংবাদ। ১৭৪৮ সালের ১৮ই জানুয়ারি কোর্ট হাউসেই জন্ম নিল এক ঘরোয়া আলোচনা সভা, ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’। লক্ষ একটাই ভারতবর্ষ তথা এশিয়াকে জানার বাইরে গিয়ে আরো নতুন করে জানা, নতুন করে চেনা। এশিয়াটিক সোসাইটি-কে প্রাচ্যবিদ্যার পীঠস্থান হিসেবে পাকাপাকি ভাবে গড়ে তোলার জন্য ১৮০৬ সালে বেছে নিলেন বেরিয়াল গ্রাউন্ড রোডের ধারে ১ নং বাড়িটিকে, যে রাস্তা বর্তমানে পার্ক স্ট্রীট নামে খ্যাত। এবং এই পার্ক স্ট্রীটের এখন বোধহয় সবথেকে প্রাচীন বাড়িই হল এই এশিয়াটিক সোসাইটি। জোন্স থাকাকালীন এই এশিয়াটিক সোসাইটিকে তৈরি করেছিলেন দুর্লভ সমস্ত পাণ্ডুলিপির মূল সংগ্রহশালা। প্রায় এক লক্ষের উপর বই আছে এখানে, দর্শন থেকে বিজ্ঞান থেকে ধর্ম কিংবা সাহিত্য; সবই এশিয়ার প্রকৃতি ও মানুষদের বিষয়ে। ভারতবর্ষে বিজ্ঞানের আলোচনা এবং গবেষণাও শুরু হয়েছিল জোন্সের হাত ধরে এই এশিয়াটিক সোসাইটিতে। কোলকাতার যাদুঘর তৈরির আগে অব্দি এশিয়াটিক সোসাইটিতেই ছিল কোলকাতার প্রথম যাদুঘর। ভারতের ভূতত্ত্ব, প্রাণীতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্বের সূচনা এই সোসাইটিতে। এগারো বছর কোলকাতায় ছিলেন জোন্স। ইচ্ছে ছিল অষ্টাদশ শতকের শেষ বছরে দেশে ফিরবেন। কিন্তু লেডী জোন্সের দেশে ফিরে যাওয়ার পর সময়ের সীমারেখাটাকে আরো কমিয়ে এনেছিলেন তিনি। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে জীবনটাকে চিরকালের মতো দান করে গেলেন জোন্স। রাম বিনা যেমন ‘রামায়ন’ অসম্পূর্ণ, জোন্স বিনা এশিয়াটিক সোসাইটিও তাই। তাই জন্যই তিনি শুধু স্যার উইলিয়াম জোন্স নন- তিনি ‘এশিয়াটিক জোন্স’।             

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...