Skip to main content

পালকি আর ধর্মঘট




বন্ধ! ধর্মঘট! শব্দগুলো শোনার পরই টিভির-পরদায় চোখ- কোথায় কি ট্রেন আটকালো, কোথায় রাস্তা কতটা সচল। কিন্তু ভাবুন তো আজ থেকে ২০০ বছর আগে টিভি-ই বা কোথায় ছিল বা এই বন্ধের খবরই বা কোথা থেকে পেত মানুষ? তাও আবার কোলকাতার নগরবাসী! আপনি তখন বলবেন, ‘ধুর, তখন যানবাহন-ই বা ছিল কটা যে ধর্মঘট করবে যানবাহনের ইউনিয়নরা!’। তবে শুনে রাখুন কোলকাতা জন্ম ইস্তক ধর্মঘটীদের শহর। এ শহর বড় হয়েছে ধর্মঘট দেখতে দেখতে। ‘চাক্কা বন্ধ’ তখন শব্দ-টা যথাযোগ্য ছিল কিনা সেটা বাকিটা পড়ার পর বুঝে নেবেন। অষ্টাদশ শতকে কোলকাতার বাহন বলতে ছিলই দুটি পা। অর্থাৎ পদব্রজে গমন, অথবা পালকি। সেও তো হেঁটেই হল তো নাকি। কাঁধে ভর করে বাকি চারজন কি দুজনের পদব্রজের ভরসায় পথ চলা। গ্রীষ্ম, বর্ষা কিছুই নয় পালকি বেয়ারাদের কাছে। ঘন্টায় নয় থেকে বারো মাইল, কোলকাতা থেকে এলাহাবাদ কিংবা কাশী; সর্বত্রই পালকির যুগ, পালকিই ভরসা। সে বড়মানুষের তীর্থযাত্রা হোক অথবা বিধবা মা ঠাকুরনের গঙ্গা স্নান হোক। পালকির দামও ছিল তখন বেজায়। বাড়িতে দুই একখানা প্রাইভেট পালকি না থাকলে বড়মানুষী বোঝানো যায় না। তারউপর রংচঙে পালকির দাম প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিনহাজার টাকা খরচ। তার উপর আছে পালকির বেয়ারাকুলের মাইনে। মধ্যবিত্তরাও পালকি চড়তেন তখন। যদিও সে খরচা খুব একটা কম নয়। কোলকাতা থেকে কাশীর ভাড়া ৫০০ সিক্কা টাকা। তাই পালকি করে আর তাদের তীর্থ করা হয় না। কাছাকাছি যাতায়াতের ভাড়াও নেহাত কম নয়। প্রতি ক্রোশে এক টাকা দুই আনা। এইবারে আসি পালকি বেয়ারাদের কথায়। এমনটা ভাবার কোনো কারন নেই যে তাদের অবস্থা ভালোই ছিল। আজকের রিক্সাওয়ালাদের মতো ওরাও ছিল মজুর। পালকি থেকে একটা ভাড়ায় যা আসত সেটা ভাগ হত চারজনের মধ্যে। মাথাপিছু দৈনিক রোজগার মাত্র ৪ আনা। সাহেবের বাঁধা চাকরি হলে আরো কম। মাথাপিছু মাসিক মাইনে তাদের ৫ টাকা। এমন করে হলেও চলে যেত তাদের। কিন্তু সহসা বিপাকে তারাও পড়ল কোম্পানির দৌলতে। ১৮২৭ সালের কথা। সহসা পুলিশ বিভাগ থেকে নোটিশ এল যে ঠিকা পালকি সব রেজিস্ট্রি করাতে হবে। আর বেয়ারাদের নিতে হবে লাইসেন্স নম্বর। সেই নম্বর খোদাই করা থাকবে একটি পিতলের চাকতির ওপর, আর সেটা ধারন করতে হবে বাহুর উপর। কিন্তু বেয়ারারা সকলে উৎকলবাসী, একতা তাদের বড়ই প্রবল। খেপে গেলো তারা। পালকি বয় বলে কি তাদের মান-অপমান নেই, আবার পিতলের পাত লাগাতে হবে হাতে? বেয়ারাদের মিটিং-এ ঠিক হল পালকি-বেয়ারারা সব হরতাল করবে । ধর্মঘট। ২১ মে তারিখে গঠিত হল তাদের এক সংগ্রাম পরিষদ। সিদ্ধান্ত নিল যতদিন না এই অন্যায় আইন উঠছে ততদিন কেউ পালকি ছোঁবে না। ২১ মে ১৮২৭ এর দুপুরের একটু আগে ময়দানে সমবেত হলেন সমস্ত পালকি বেয়ারার। তারপর মিছিল করে তারা সকলে চললেন লালবাজারে পুলিশ অফিসের দিকে। কিন্তু পুলিশ এই দাবী মানল না। ফলে প্রতিবাদীরা ফিরে গেল সকলে। ফেরার পথে সুপ্রিম কোর্টের মাঠে আরও একদফা বিক্ষোভ। সাহেবরা ভাবল এ নেটিভদের হুজুগ। কিন্তু পরদিন সকালে ছোট সাহেবের ঠিকা পালকি অনুস্পস্থিত। মেজ সাহেব জাবেন শ্বশুরবাড়ি। হরকরা ঘুরে এসে বল শহর জুড়ে কোনো পালকি নেই। সেই প্রথম দেখল কোলকাতা যানবাহনের ধর্মঘট।            

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...