
আজকের দিনে এই শব্দটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটা শব্দ। শব্দটা ছোটো, কিন্তু এর জ্বালা ভয়ানক। আর আমাদের কোলকাতা জন্মের প্রথমেই হাজার হাজার এই শব্দওয়ালা মানুষদের নিয়েই চার্ণকের কাছে ধরা দিয়েছিল। শব্দটা হল 'বেকারত্ব'। হ্যাঁ, কোলকাতা জন্ম থেকেই বেকার। এ শহর বেকারত্ব নিয়েই বড় হয়েছে। এখনও কোলকাতা তার বেকারত্বের ধারাবাহিকতা অনেকাংশেই বজায় রেখেছে। আমরা যদি সপ্তদশ শতাব্দির দিকে ফিরে যাই তখনও দেখবো একই অবস্থা। চার্ণক তখন সদ্য সুতানটিতে নেমেছেন। নিমতলায় বসে হুঁকো ফুঁকছেন, সেই দিনটা একটু স্মরন করুন। ঘাটে বাঁধা তাঁর বিরাট বজরা থেকে ভেসে আসছে পাটনাই গান। দূরে পালকির হাতল ধরে দণ্ডায়মান ভিন্ন প্রদেশের বেয়ারার, তাদের কিন্তু কেউ কোলকাতার নয়। সাহেবের সাথে যারা বসে তারা আরোও দূরের, আর্মেনিয়ান। আর সুতানটির হাড্ডিসার জোয়ান ছোকরা তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্যালা গানের কলি আওড়াচ্ছে আর সাহেবের তামাক খাওয়া দেখছে। সন্ধ্যে গড়িয়ে গেলেও তার কিন্তু নড়ন-চড়ন নেই। কারন তার মধ্যে এই বোধটাই নেই যে সে বেকার।সাহেবরা নতুন দেশ বলে তখন চাঁদপাল ঘাটে নামেন, সঙ্গে কাবুল থেকে আনা মুধল আয়া, লখনউ থেকে আনা বাবুর্চি, ওড়িশা থেকে আনা শ্রমিকের দল, আর দিল্লী থেকে সিপাহী। আর গোবিন্দপুর-কোলকাতার ভাগ্যে? তারা সকলে ছুটল কোলকাতা থেকে দশ বারো মাইল দক্ষিণে ভাটিয়াল দিকে। নোঙর ফেলার আগেই জাহাজ ধরতে হবে তাদের। অন্তত হুকো-বরদার, ঘেসুড়ে কিংবা মশালচির কাজ তো তাদের চাই। তারও হাঙ্গামা কম নয়। হোটেল কিংবা ট্যাভারনে কান খাড়া করে ঘোরাঘুরি করতে হয়, কবে জাহাজ আসবে সেই খবরের জন্য। অবশ্য কাজ যে কেউ পেত না তা নয়। যেমন পেয়েছিলেন নকু ধর, রতু সরকাররা। জাহাজঘাটায় নতুন সাহেব নেমেছেন, তার জন্য তো দোভাষী চাই। কোনো রকমে 'ইয়েস' আর 'নো' দিয়েই পাকা মাইনের চাকরি হয়ে গেলো সাহেবকুঠিতে। এছাড়া আরো একটা একচেটিয়া চাকরি তো বাঙালির মজ্জায় মজ্জায় ছিল; দালালি। সাহেবকুঠিতে কত খরচ হবে, এ বাবু তার হিসেব রাখবেন। চাকর-বাকর খাটাবেন। বলতে গেলে তিনি সাহেবকুঠির সরকার। মুৎসুদ্দির চাকরিও ভালো, কিন্তু তাতে অনেক টাকা চাই। ডিপোজিট রাখতে হয়, কখনও কখনও সেলামীও দিতে হয়। তার উপর ধরাধরি আছে, সই সুপারিশ আছে। বেনিয়ানগিরি তো আরোই কঠিন। ট্যাঁকে যাদের ব্যাংক আছে তাঁরাই বেনিয়ান হতে পারেন। আর সরকারি আপিস তখন চাকরি? হেয়ার সাহেবের সুপারিশে তখন কেরানিগিরিও পাওয়া কষ্টকর। অবশেষে কোলকাতার সন্তানেরা ব্যাবসার পথ ধরলেন। কিন্তু সেও ঐ দুদিনের জন্য। ক্রমে রোল্ট, হ্যামিলটন, মিং গিবসন কোম্পানি প্রভৃতির আগমনে বঙ্গ-ব্যাবসাতেও বেকারত্বের জ্বালা এসে উপস্থিত হল। কোলকাতার মানুষ আবার বেকার হলেন। সাথে আর একটা কথা যুক্ত হল ব্যর্থ ব্যাবসায়ী বাঙালী। এর কিছুকাল পরে যদিও বাঙালির এই বদনাম ঘুচিয়েছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, পীরিতরাম মাড়, রধাকান্ত দেব। তবে একটা জিনিস ভেবে দেখবেন, এই বেকারত্ব আছে বলেই কোলকাতা কিন্তু কোলকাতা হয়ে আছে। যদি এই বেকারত্ব না থাকত তাহলে কোলকাতা বলতে শুধু বোঝাতো- ডালহৌসির কাহ্নকয় কেরানিশালা আর বড়বাজারের গুটিকয় গুদাম। এই বেকাররা আছে বলেই না তারা রাস্তায় রাস্তায়, পাড়ার অলিতে গলিতে আলোয় কিংবা রঙে কোলকাতাকে করে তোলে কল্লোলিনী তিলোত্তমা।
Comments
Post a Comment