আচ্ছা গৃহশিক্ষক কারা?
সকলেই বলবেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে যারা বিদ্যা দান করেন, অবশ্যই উপযুক্ত গুরুদক্ষিণা
সমেত। পুরাতন জনৈক এক রসবোধ পরিপূর্ণ লেখকের মতে গৃহশিক্ষকতা হল বাংলার অন্যতম
কুটিরশিল্প। ‘কুটিরশিল্প’ বলাই যায় কেননা ব্যাপরটা নিতান্তই ঘরোয়া। ভদ্রলোক
নিশ্চয়ই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। যাই হোক, কথায় আছে যে কোনো প্রথা একদিনে হয় না,
কিংবা রোম নগরী একদিনে তৈরি হয়নি। গৃহশিক্ষকতাও তাই। কোলকাতার জন্মের কিছুকাল পর
থেকেই এদের আবির্ভাব বলে ইতিহাসের বক্তব্য। কোলকাতায় তখন মাঝারি গোছের একজন
মাস্টারের মাইনে মাসে ২০/২৫ টাকা। যেখানে স্কুলের মাইনে বছরে ২ টাকা, সংস্কৃত
কলেজের আর হিন্দু কলেজের ছাত্রদের মাইনে ছিল না। কোলকাতার ব্যাবসায়ীকূল বুদ্ধিমান।
তৎকালীন সমসাময়িক একটি খবর পাওয়া যায়, “একজন বিষয়ী লোক আপন বাসার এক ব্রাহ্মনকে কহিলেন, ‘ওহে ঠাকুর, আইস আমি তোমায় এক টোল করিয়া দিই, কিন্তু যত টাকা লভ্য হইবেক
তাহা সকল আমি লইব। তুমি ১০ টাকা হিসাবে মাহিয়ানা পাইবা আর বাসা খরচ ও ভাগ্যের কাপড়’”।
ভবানীচরন বন্দ্যোপাধ্যায় ‘নববাবু বিলাস’-এর মুনশি বৃত্তান্ত-এ আছে, “বাবুদের লেখাপড়া
শিখাইবার জন্য বাড়ির কর্তা প্রথমে একজনকে ডেকে পাঠালেন। বলিলেন- তুমি আমার
সন্তান্দিগকে পারসী পড়াইবা এবং বহির্দ্বারে থাকিবা...মায় খোরাকি ৩ তঙ্কা পাইবা”।
এসব যদিও নেটিভপাড়ার সংবাদ। এবার সাহেবপাড়ায় আসা যাক। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ
প্রতিষ্ঠার(১৮০০) আগে থেকে মুনশির খোঁজে সাহবেরা হন্যে হয়ে ঘুরতেন নেটিভপাড়ায়।
নিয়ম হল, যারা হিন্দুস্থানি ভাষা শিখতে পারবে তারা ২০ পাউন্ড গ্র্যাচুইটি পাবে।
এসব ১৬৭১ সনের কথা। কেরী সাহেব নিজের মুনশি রামরাম বসুকে দিতেন মাসে ২০ টাকা। ১৭৫৫
সালে তরুন রাইটার হেস্টিং-এর মুনশি নিযুক্ত হন নবকৃষ্ণ দেব। তিনিই মনে হয় কোলকাতার
সবথেকে সফল গৃহশিক্ষক। নিয়োগের সময় তার মাইনে ছিল মাসে ৬০ টাকা। বছর তিনেক
কোলকাতায় হেস্টিংস কাটিয়ে যখন কাশিমবাজারে চলে যান, তখন বড় মানুষদের পার্শ্বচরের
মতো মুনশি নবকৃষ্ণকেও নিয়ে গেলেন। একবার নাকি এই গৃহশিক্ষক প্রায় ৩ লক্ষ তাকা ধার
দেন হেস্টিংসকে। জনশ্রুতি যে হেস্টিংস সে টাকা শোধ করেননি। যদিও নবকৃষ্ণ-এর তাতে
বিশেষ কিছু যায় আসেনি, কারন মায়ের শ্রাদ্ধ উপলক্ষেই তিনি খরচ করলেন ৯ লক্ষ টাকা।
অবশ্য সাহেব-ছাত্র পড়ানোর অনেক ঝুঁকিও ছিল। কারন তারা শুধু ছাত্র নন, প্রভু। ১৮১০
সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের শিক্ষক আনন্দচন্দ্র শর্মা অভিযোগ এনেছিলেন জনৈক কেনেডি
সাহেবের বিরুদ্ধে। অভিযোগ ছিল- “নিরপরাধ আমাকে অনেক ঘুষা ও থাবড়া এমন মারিয়াছেন যে
আমি দুই দিবস শয্যাগত ছিলাম”। ২৩ শে জুলাই ১৮৩১ এ ‘সমাচর দর্পণ’ এ ছাপা হল- “ভদ্র
সজ্জনদের উচিৎ আপন আপন পরিজনের প্রতি কৃপাবলোকন করিয়া কোন বিদ্যাবতী স্ত্রীকে নিজ
বাটিতে রাখিয়া তাহাদিগকে বিদ্যাশিক্ষা করান”। ফলে এই বিজ্ঞান ভর করেই গৃহশিক্ষক
উঠে এলেন ঘরে। নারীমুক্তির ইতিহাসে বোধহয় অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা এটা। রসিক
ঐতিহাসিকরা এখনও বলেন, কোলকাতায় এই অবিস্মরণীয় ঘটনার ষোলোআনা কৃতিত্ব প্রাইভেট
টিউটরের। সাহেব কিংবা বাঙালীপাড়া দু-পাড়ার মেয়েরাই তাদের মন্ত্রে শুনেছে জীবনের
নতুন অর্থ।
‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...


Comments
Post a Comment