Skip to main content

একটি তারকার কাহিনী।



“SACRED TO THE MEMORY OF MARIA MADELINE TYLOR who died on 13th May, 1841 AGED 27 YEARS”। শুধু একটা নাম। কার স্ত্রী, কার কন্যা বা কী পেশা কিছুই লেখা নেই। কেউ হয়তো প্রয়োজনও মনে করেনি সেসব কথা লেখার। কিন্তু সন্ধানীরা জানেন এই ২৭ বছর মেয়েটির তখন কোলকাতার এক অন্যতম খবর। মারিয়া ম্যাডেলিন টেলর। ওরফে মাদাম দারমেনভিল তখন কোলকাতার প্রিয়তম নায়িকা। টেলরদের আদিবাস ছিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। শোনা যায় তাঁর সময়ে যেমন নামজাদা অভিনেত্রী ছিলেন তিনি, তেমনই ছিল তাঁর গানের গলা। সারা সিডনি শহর তাঁর অভিনয়ে ভেঙে পড়ত রঙ্গমঞ্চের দরজা। এমন করে ছ’বছর কেটে গেলো শীর্ষতালিকায় থাকতে থাকতে। কিন্তু এর মাঝে বাধ সেধে বসলেন তাঁর স্বামী মিঃ টেলর। ভদ্রলোক ছিলেন অপদার্থ বেকার মানুষ। নারী হয়ে রোজগারের যে পন্থা নিয়েছিলেন মিসেস টেলর তাতেও অসুবিধে হল না। গোলমালটা বাধল অন্য জায়গায়। মিঃ টেলর খুব সুন্দর উপায়ে তাঁর মদ্যপানের নেশাটি রপ্ত করিয়েছিলেন নিজের স্ত্রী-কে। যার ফলে হল কি মিসেস টেলরের কোকিলকণ্ঠী আওয়াজের অবনতি ঘটল। ফলে মাদাম আর থাকতে চাইলেন না মিঃ টেলরের সাথে। তাঁকে ছেড়ে বেরিয়ে এসে গাঁটছড়া বাঁধলেন ক্যাপ্টেন পিরে সারগেট বা লারগেটিউ-র সাথে। ক্যাপ্টেন বলতে তিনি কোনো সৈন্যদলের ক্যাপ্টেন নন। নিজের বলতে ছিল শুধু একখানি জাহাজ। দুজনে তাই ঠিক করলেন চলে আসবেন পূর্বদেশে। তাই ক্যাপ্টেন জাহাজটি বিক্রি করে সেই মূলধনে এসে বসলেন কোম্পানির কোলকাতায়। কোলকাতায় এসে বড় মানুষীতে পেয়ে বসল লারগেটিউকে। তিনি ব্যারন সাজলেন। অতঃপর তাঁর নাম হল হেনরি দারমেনভিল। বাড়ি কিনলেন পার্ক স্ট্রীটে। ফ্ল্যাট নয়, গোটা একটা আস্ত বাড়ি। পার্ক স্ট্রীট তখন জমজমাট। চৌরঙ্গী থিয়েটার তখন উঠে গিয়ে নতুন থিয়েটার সাঁ সুচির প্রতিষ্ঠা হয়েছে। মাদাম দারমেনভিল সেখানে কাজ জুটিয়ে নিতে চাইলেন। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ালেন মিসেস এস্থার লিচ, সাঁ সুচির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, এককালের মালিকও। তাই নিরাশ হয়ে ফিরে এলেন মিসেস দারমেনভিল। ঠিক করলেন নিজেই কোনো নাটকে কোনো একটা মঞ্চে অভিনয় করবেন। সেই মর্মে শহরের ইংরেজি কাগজে বিজ্ঞাপন বেরল এই হিসেবে যে টাউন হলে মঞ্চস্থ হবে শেকসপিয়ারের নাটক “The Taming of the Shrew”, তাতে ক্যাথরিনের ভূমিকায় থাকবেন মাদাম নিজে। দিন ধার্য হল ২৫ মে, ১৮৪১ সাল। সব ঠিক। টিকিটও বিক্রি হল যথেষ্ট। কিন্তু অভিনয়ের আগের দিন কলেরায় প্রান হারালেন স্বামী হেনরি দারমেনভিল। নতুন দেশে একা হয়ে পড়ার জন্য ভেঙে পড়লেন টেলর। নতুন দিনা আবার ঠিক হল নাটকের, ১৫ই এপ্রিল, ১৮৪১। ভালোভাবেই মঞ্চে প্রতিস্থাপন করলেন তাঁর নাটক। এরপর আবার ২৯ এপ্রিল। নাটক “Mischief Making”, একটি গীতি-প্রধান হাসির নাটক। এবারেও টাউন হল প্রেক্ষাগৃহ। দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়ে বাড়ি ফিরলেন মিসেস দারমেনভিল। কিন্তু অন্যদিকে বিপত্তি হল। টাউন হল থেকে কয়েক পা দূরে বেঙ্গল ক্লাবে ঘটল এক আত্মহত্যা। নাটক দেখে ফেরার পর নিজের বন্দুক নিয়ে নিজেকে হত্যা করেছেন ক্যাপ্টেন হ্যামিলটন কক্স। সামান্য আত্মহত্যা নিয়ে কানাঘুষো হওয়ার কথা নয়, কারন এটা তখন সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু হল। কারন কক্স ছিলেন মিসেস টেলারের অন্তরঙ্গ বন্ধু। শোনা যায় স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর সাথেই গাঁটছড়া বাঁধবেন বলে ঠিক করেছিলেন। কিন্তু মিঃ কক্স সেইদিনই দেশ থেকে তাঁর স্ত্রীর লেখা চিঠি পান যে তিনি পুত্র-কন্যা সমেত জাহাজে কোলকাতা আসছেন বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য। রহস্য আরো ঘন হয়ে উঠল দিন পনেরো পর, ১৩ মে ১৮৪১। শহর জুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়ল মিসেস টেলর মারা গেছেন। ডাক্তার রিপোর্ট দিল কলেরায় স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু লোকে সন্দেহ করল আত্মহত্যা। হয়তো বা তাই, হয়তো বা নয়। খুঁজলে আসল কথা হয়তো বলতে পারতেন লোয়ার সার্কুলার রোডের কবরখানার কবরে শুয়ে থাকা সেই ২৭ বছরের মেয়েটি, তাঁর ফলক অনুযায়ী যে কিনা কারুর স্ত্রী নয়, কারুর কন্যা নয়, কোনো অভিনেত্রী নয়। শুধুই একজন নতুন দেশে আসা একাকী নারী।            

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...