Skip to main content

কাফি হৌসের গল্প।



কলেজ স্ট্রিট গেছেন? যদি আপনার উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে নিশ্চয়ই ‘ইন্ডিয়ান কফি হাউস’-ও গিয়েছেন আপনি। যদি এটার আপনার উত্তর ‘হ্যাঁ’ও হয়, অথবা ‘না’ও হয়, তাও জেনে রাখুন এই কোলকাতার জন্মের কাল থেকেই এই কাফি হৌসের জন্ম। হালফিলের সিসিডি-র সাথে কোনো তুলনা চলে না এর। প্রায় অষ্টাদশ শতক থেকেই কাফি হৌসের গল্প শোনা যায়। কোলকাতার সবথেকে পুরনো কফি হাউসটির জন্ম ১৭৬২ সালে। অবশ্য সেটি ছিল একটি ‘কফি রুম’ মাত্র। ১৭৬২ সালের ২১ জুনের খবর পাওয়া যায় যে উইলিয়াম পার্কস নামে এক সাহেব কোম্পানির বোর্ড অফ ডিরেক্টরদের কাছে আবেদন করেন শহরের অন্যত্র তিনি একটি বাগানবাড়ি কিনেছেন, এবং তাঁর ইচ্ছে সেটিকে তিনি ভদ্র ও মহাশয়দের খানাপিনা এবং আমোদআহ্লাদের কেন্দ্রে পরিণত করা। কারন কোলকাতায় তখন এমনিতেই হোটেল বা ট্যাভার্নের অভাব। কিন্তু কোম্পানির নিয়ম হলঃ ‘আপিস টাইমে সেটিকে বন্ধ রাখতে হবে’। সেইকারণেই হয়তো কফিবোর্ড তাদের কফি হাউসগুলি বন্ধ করে দেন রাত আটটায়। যাইহোক, নতুন এই কফি হাউসের নাম হল ‘লন্ডন হোটেল’। মদ্যাপি বাদ দিলে খানাপিছু খরচ পড়ে মাত্র এক মোহর। মদের দাম আলাদা। এক কাপ কফির দাম এক সিক্কা টাকা। কিন্তু দিন বাড়লে মানুষের মন একটুতে সন্তুষ্ট হয় না। তাই ১৭৮৮ সালে জন্ম হল ‘ক্যালকাটা এক্সচেঞ্জ কফি হাউসের। এখন সে বাড়িটিকে বলা হয় ‘রয়াল এক্সচেঞ্জ’। ক্যালকাটা এক্সচেঞ্জের বিজ্ঞাপনে জানানো হল এই কফি হাউসটি ভদ্রলোক, বণিক এবং ব্যাবসায়ীদের জন্য। ছাত্রদের আমন্ত্রন তালিকা নেই কারন কোলকাতায় তখন ছাত্র কম।  কিন্ত এখানে কফি খেতে হলে মেম্বার হতে হবে, মাসে ৪ টাকা চাঁদা। অর্থাৎ এক্সচেঞ্জ কফি হাউস ছিল কিছুটা ক্লাবের মতো। তাই এখানে আড্ডা জমলেও ব্যাবসা তেমন জমল না। হঠাত একদিন ঘোষণা হল যে এক্সচেঞ্জ কফি হাউস বিক্রি হবে। অনেক ঋণ হয়ে গেছে মালিকের। ঠিক হল লটারিতে বিক্রি হবে সেটি। ১০০ টাকা করে টিকিট, আর ষোল হাজার টিকিট। সে কফি হাউসের পরিণতি যে শেষ অব্দি কি হয়েছিল তা জানা নেই। ১৭৯০ সালে আরও এক কফি হাউসের কথা শোনা যায় ‘জেরুজালেম কফি হাউস’। জন ম্যাকডোনাল্ড নামে এক মাস্টার শুরু করলেন এর জয়যাত্রা। আজকের কাউন্সিল হাউস স্ট্রীট যেখানে ডালহৌসি স্কোয়ারের সাথে মিলেছে, সেখানেই ছিল এই কফি হাউস। কিন্তু শেষ অব্দি সেটিও চলল না দেনার দায়ে। ওয়েলেসলি ১৮০০ সালে সেই বাড়িটি ধার চেয়ে তাতে খুলে বসলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। এখন সেখানে হংকং অ্যান্ড সাঙ্ঘাই ব্যাঙ্কের অফিস। ১৮৫৮ সালে কোলকাতার অকল্যান্ড হোটেল খুলল ‘জেরুজালেম রুম’ নামে কফি হাউস। আর এখানেই প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ালো এখানকার আড্ডাখানা, পড়ার ঘর, তথা কালচারের নাট-মন্দির। কিন্তু ক্রমে সেটাও উঠে গেল ইয়ং বেঙ্গলদের ভিড়ে। তারা শাক্ত মতের নব্য সাধক। কফি তো তাদের নিরামিষ ঠেকবেই। তাই কোলকাতা জন্ম দিয়েছে অনেক কফি হাউসের। কিন্তু টেকেনি কেউই। শুধু খদ্দেরের উৎসাহে তো আর ব্যাবসা চলে না।     

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...