Skip to main content

একটি দশ টাকার কবর।



কোলকাতার কাসিয়াবাগান কবরখানা। ইংরেজদের যেমন সাউথ পার্ক স্ট্রীট সিমেট্রি, মুসলমানদের তেমনি কাসিয়াবাগান। কাসিয়াবাগান কবরখানা বলতে বনেদি মুসলিমদের কবরখানা। কিন্তু এখন তা দেখলে মনে হবে না এখানেই মাটির তলায় ঘুমিয়ে আছেন মহীশূরের আর অযোধ্যার নবাবরা। খুঁজলে হয়তো পাওয়াও যাবে না সেই দীনতম কবরটি, যার জন্য মাত্র বরাদ্দ করা হয়েছিল ১০ টাকা। ১৭৯৪ সাল। মহা ধুমধাম করে নবাব আসফদৌল্লা বিয়ে দিলেন তার পোষ্যপুত্র ওয়াজির আলির। পরবর্তী অযোধ্যার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী বলে বিয়েতে খরচ করলেন তিরিশ লক্ষ টাকা। মাস ভরে উৎসব হল অযোধ্যায়। তিন বছর পরে, ১৭৯৭ সালে বিদায় নিলেন আসফদৌল্লা। সিংহাসনে বসলেন ওয়াজির আলি। কিন্তু তিনি ছিলেন সিরাজের মতোই অসহিষ্ণু নবাব। ফলে সিংহাসনে বসতে না বসতেই তিনি ইংরাজদের চোখে শত্রু হয়ে উঠলেন। সময় থাকতে ইংরাজরা সিংহাসনচ্যূত করল ওয়াজিরকে। ওয়াজির লখনউ থেকে চলে এলেন বেনারসে। বেনারসের রেসিডেন্ট জর্জ চেরির দরবারে ডাক পড়ল তার। ১৪ জানুয়ারি, ১৭৯৯। ওয়াজিরকে অভ্যর্থনা জানাতে এলেন চেরি। কিন্তু এসেই বিপদে পড়লেন তিনি। ওয়াজির একা আসেননি। সঙ্গে এসেছে রাশি রাশি নবাবের অনুগত ফৌজ। পালাবার পথ নেই তখন। মিঃ চেরি ফৌজদের হাতে প্রান হারালেন। মারা গেলেন ক্যাপ্টেন কনওয়ে এবং মিঃ গ্রাহাম। ওয়াজির আলির ক্ষিপ্ত অনুচরেরা চল তখন জজ সাহেবের কুঠির দিকে। অসীম বীরত্বে তাদের ঠেকিয়ে রাখলেন বিচারপতি মিঃ ডেভিস। আর ওয়াজির আলি পলায়ন করলেন বেরার-এ। শেষে বেরারেই ইংরাজদের হাতে ধরা পড়ে ওয়াজির আলিকে সোজা নির্বাসন দেওয়া হল কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে। জীবনের শেষ দিনগুলো কোলকাতায় একেবারে অসহায়ের মত কেটেছিল ওয়াজির আলির। তা সত্ত্বেও দীর্ঘ সতেরো বছর বেঁচেছিলেন তিনি। ১৮১৭ সালের মে মাসে তিনি দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুর পরেও ইংরাজরা শান্ত হল না। তার মৃত্যুর পর ফোর্ট উইলিয়াম আদেশ দিল ওয়াজির আলির শেষকৃত্যে যেন সত্তর টাকার বেশি খরচ না হয়। অর্থাৎ অন্যান্য সব খরচ মিটিয়ে কবরের জন্য বরাদ্দ হল মাত্র দশ টাকা। ইংরেজরা ভালোই জানত তেইশ বছর আগে এই তরুণটির যখন বিয়ে হয়, তখন খরচ হয়েছিল তিরিশ লক্ষ টাকা। তাই কাসিয়াবাগানে গেলে আজ হয়তো আর সেই দীনতম কবরটি পাওয়া যাবে না, কারন এই সামান্য অর্থবলেই হয়তো দেড়শো বছর একটানা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি বেচারা।    

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...