Skip to main content

সিপাহি বিদ্রোহের একদিন।


১৪ই জুন, ১৮৫৭। রবিবার দিন। ময়দানের উপর দিয়ে সারি সারি লোক দল বেধে চলেছে পশ্চিমে, গঙ্গার তীরে। পুরো, হাফ, বড়, ছোট, বাচ্চা, মেম- সব সাহেব ছুটেছে ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে। তার ডানদিকে গঙ্গায় গেলেও শান্তি। কারন সেখানে সার সার পাল তুলে দাঁড়িয়ে আছে জাহাজ। আজকে এই জাহাজ আর ওই দুর্গই তাদের একমাত্র সহায়। কেননা শহর জুড়ে খবর ছড়িয়েছে যে পাণ্ডেরা আসছেন। অর্থাৎ কিনা সিপাহিরা, যারা কিনা কদিন আগে ৩ মে লখনউ আর ১০ মে মিরাটে ক্ষেপে উঠেছে কোম্পানির বিরুদ্ধে। ২৪ মে রাজভবনে ধুমধাম করে পালিত হল রাণী ভিক্টোরিয়ার জন্মদিন। ওইদিনই নাকি মুসলমানদের ইদ। ফলে কলকাতার মানসিক অবস্থা যে খুব একটা সুস্থ ছিল তা বলা যায় না। বে-সরকারি রিপোর্ট বলে যে বাড়ির কর্তা যখন রাজভবনে পার্টিতে ব্যাস্ত তখন বাড়ির লোকজন কেঁদে কেঁদে আকুল। এই জন্য নয় যে তারা পার্টিতে যেতে পারেনি, বাড়ির কর্তা যদি ফেরার পথে পাণ্ডেদের হাতে পড়ে বেঘোরে প্রান দেন, সেই ভয়। অন্য রিপোর্ট বলে যে এক মহিলা নাকি পাণ্ডের ভয়ে সেই রাতে তার বাড়ির পাহারায় দুই গোরা সৈন্যকে মোতায়েন করেছিলেন। যদিও পাণ্ডেদের থেকে তার বেশি ভয় ছিল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ওই দুই অচেনা সৈনিককে। বিশেষ করে বাড়ি যখন ফাঁকা। তবুও পরের দিন রাজ সরকারের সেক্রেটারি বিডন সাহেব লিখেছেন যে রাজধানী কলকাতার ছশো মাইলের মধ্যে কোনো গোলমাল নেই, সব শান্ত। কলকাতার সেই সময়ের কাগজ পড়লেও তাই মনে হবে; গোটা উত্তর ভারত যখন জ্বলছে সিপাহিদের হাতে, তখন কলকাতার সাহেবরা রেস কোর্স নিয়ে ব্যাস্ত- মাঠে ঠিক মতো জল দেওয়া হচ্ছে না, ঘোড়াদের ঠিকমতো দেখাশুনা করতে হবে। যাইহোক, তবুও একদিন কানাঘুষায় খবর এল যে ব্যারাকপুর থেকে পাণ্ডেরা কলকাতায় আসছে। এদিকে গার্ডেনরিচেও নাকি শুরু হয়ে গেছে লুঠতরাজ, কারন সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে অযোধ্যার নবাবের হাজার হাজার ভূতপূর্ব সৈন্য। সুতরাং সব সাহেব মিলে ছুটল ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে আর জাহাজঘাটায়। এইসময় কলকাতার ভল্যানটিয়ার বাহিনীর কথা বলতে হয় যেটা তৈরি হয়েছিল সিরাজের কলকাতা আক্রমনের সময়। এবং এই বাহিনীর জনক ছিলেন কলকাতার কালেক্টর ফিলিপ মিলনার ডেকার্স, যার নামে আজকের কলকাতার ডেকার্স লেন। শনিবার রাত থেকে এই ভল্যানটিয়ার বাহিনীর দৌরাত্ব শুরু হল। রবিবার সকাল থেকে শহরের প্রায় সব জায়গায় মোতায়েন তারা। তাদের দেখা দেখি কোম্পানির সৈন্যরাও মারচ করতে করতে বেরিয়ে এল কলকাতার রাস্তায়। তবুও ভয় কাটে না গোরাদের। ভল্যান্টিয়ার বাহিনী দু দলে ভাগ হয়ে টহল দিয়ে বেড়াল গোটা শহর। আর চলল বেমক্কা পটকা ফাটিয়ে সজাগ রাখার উৎপাত। কিন্তু পর্বতে মূষিক প্রসব। পরে সেইদিনই সন্ধ্যের দিকে শোনা গেল যে পাণ্ডেরা আর আসছে না। গতকালই তাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রন করা হয়েছে। গার্ডেনরিচেও লুঠতরাজ হয়নি। বরং অযোধ্যার ভূতপূর্ব নবাব এখন কারাগারে বন্দী। সুতরাং আবার সয়ে সয়ে গোরাতে মিলে সকলে ফিরে চল শহরে। যেন খুব বড় রকম খেলা ভেঙেছে, কিংবা কোনো জনসভা। আশ্চর্য, কলকাতায় ক্ষণিকত্বরেও বিদ্রোহের আগুনের আঁচটুকু লাগল না। ধন্য এ  শহর। ধন্য তুমি।                  

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...