যারা
মোটামুটি আজকাল চারিদিকে কি ঘটছে সেদিকে নজর রাখেন, তাহলে দেখবেন ইদানিং বাংলা
ভাষা নিয়ে প্রখ্যাত এক লেখকের একটি বক্তব্য বেশ অনেককেই নাড়া দিয়ে গেছে। অনেকেই
সেই বক্তব্যের সাথে তাল মিলিয়ে, মাথা দুলিয়ে ‘হ্যাঁ তো’, ‘ঠিক তো’ বলেছেন। আজকে এই
শহর কলকাতা জুড়ে হঠাৎ জেগে ওঠা কিছু বাঙালি বাংলা ভাষা বাঁচানোর যে ‘আরবান ক্রুসেড’
নেমেছেন, বাংলা ভাষা থেকে মিশ্র ভাষা বাদ দিয়ে শুদ্ধ বাংলাকে সংরক্ষন করতে হবে বলে
গলা না ফাটিয়ে ফেসবুকে লেখালিখি করছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলে রাখি এই কলকাতা
জন্মইস্তক এক জগা খিচুড়ি ভাষা নিয়েই বড় হয়েছে। এ নতুন কিছু না। বাংলা ভাষায় কথা
বলা উচিত কি উচিত নয় সেই তর্কে আমি যাচ্ছি না এখানে। বরং কলকাতার আদিতে ভাষা নিয়ে
যে এক মিশ্র সমস্যার মধ্যে সুতানটির নেটিভ আর কোম্পানির সাহেবদের পড়তে হয়েছিল
সেটাই এখানে লিখতে বসা। মিঃ হেনরি পিটস ফরস্ট্যার নামে এক সিভিলিয়ান থাকতেন
কলকাতার রসা রোড আর চৌরঙ্গির সন্ধিস্থলে। ভবানীপুরের লোকেরা বলত ‘হাবা-ফরস্ট্যার’।
ইতিহাস বলে লোকটি ছিল প্রথম শ্রেণীর চিত্রকর, তার উপরে সে কালের শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ।
১৭৯৯ সাল তিনি দুই খন্ডে একখানা শব্দকোষ বের করেছিলেন A Vocabulary….English and Bengalee, vice-versa। সে যাক, এবার আমাদের আসল কথায় আসা
যাক। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ স্ট্রীট চেনেন? দেখবেন সেই রাস্তা ঘিরে রয়েছে আরো চারটে
রাস্তা- রতন সরকার গার্ডেন স্ট্রীট, তার ফার্স্ট লেন, সেকেন্ড লেন আর রতু সরকার
লেন। কলকাতায় এই রকম চার-চারটে রাস্তা নেই একই লোকের নামে। কি ভাবছেন রতন সরকার
গণ্যমান্য কেউ একজন? চলুন ফিরে যাই ১৬৭৯ সালে। গার্ডেনরিচে সদ্য ব্রিটিশ জাহাজ এসে
থেমেছে। শেঠ বসাকেরা ছোটাছুটি করছেন অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। কিন্তু সমস্যা একটাই-
ভাষার। কেউ কারুর ভাষা বুঝতে পারেন না। এদিকে তখনও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজও তৈরি হয়নি
যে ফারসি কিংবা উর্দু জানা সিভিলিয়ান দিয়ে কাজ চালানো যাবে। ক্যাপ্টেন স্ট্যাফোর্ড-এর
তখন একজন দোভাষী চাই; যদিও এই কথাটা তাকে বলতে হল ইংরেজিতে। বসাক মশাই ভাবলেন
সাহেবের বুঝি একজন ধোপা চাই। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পাঠিয়ে দিলেন রতন সরকারকে। রতন
সরকার ছিলেন বিলক্ষণ বুদ্ধিমান। সে ছুটে পালিয়ে এল না শেঠ মশাইয়ের কাছে। সে তখন ‘ইয়েস’
আর ‘নো’ দিয়েই দিব্যি কাজ চালিয়ে নিল। সাহেব তো মহাখুশি। সুতরাং স্থায়ী দোভাষী
হিসেবে বহাল রয়ে গেলেন রতন সরকার। আর বেচারাকে কাপড় কাচতে হল না। আর প্রভূত
ধন-সম্পত্তির মালিক হলেন রতু সরকার, যার দুশো আড়াইশো বছর পরেও যার নামে কলকাতায়
চারটে রাস্তা। সুতরাং ডিমান্ড সাপ্লাইয়ের নিয়ম এক্ষেত্রেও খাটে।
নাহলে ‘নেসফিল্ড’ মুখস্ত করে আজও কত কর্মহীন লোক এই দেশে।
‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

Comments
Post a Comment