Skip to main content

ডাকাতি থেকে ঋণের বোঝা!


শাস্ত্রে বলে  অঋণী আর অপ্রবাসী হল ‘সুখী’ ব্যাক্তি। কিন্তু কোলকাতার ক্ষেত্রে এ নিয়ম একেবারে উল্টো। জন্ম থেকেই কোলকাতার পরবাসের শহর। ভিনদেশিরা বরাবরই সুখী এখানে। আর সে যদি ঋণী হয় তবে তো কথাই নেই। ঋণ না করে কোলকাতায় সুখে থাকা যায় না। অবশ্য ঋণ না করে থাকবেই বা কি করে? কোম্পানির পক্ষে যারা আছেন, তাদের তো খাওয়াপরার কোনো ভাবনা নেই, কিন্তু শুধু খেয়ে পড়ে কোলকাতায় থাকার জন্য নেই তারা। সুখে থাকতে হলে মুঠো মুঠো টাকা চাই তাদের। অব্যাবসায়ী ইংরেজদের কাছে ঘুষ খাওয়া আর প্রাইভেট ট্রেডিং ছাড়া টাকা রোজগারের তিনটি পথ ছিল- হয় চুরি-ডাকাতি, নাহলে জাল জুয়াচুরি, নয়তো বা ঋণ করা। ডাকাতি তখন রীতিমতো একটা উল্লেখযোগ্য পেশা  তরুন ইউরোপিয়ানদের কাছে। দেশি ডাকতদের সাথে মিলেমিশে দল করত তারা। তারপর ওত পেতে বসে থাকত রাতের চৌরঙ্গীতে। যদিও চৌরঙ্গী ছাড়াও কোলকাতায় ওত পাতার মতো বনের অভাব ছিল না। অবশ্য বন ছাড়া যে ডাকাতি হয় না, তা মোটেই নয়। আজকের বউবাজারের ফরডাইস লেন তখন ‘গলাকাটা গলি’। এছাড়া হাড়কাটা গলি, গুমখানা গলি আজও আছে কোলকাতায়। এমন ডাকাত ছিল যারা দিনে কোম্পানির হয়ে কাজ করে রাতের বেলায় ডাকাতি করত। ১৭৯১ সালের ক্যালকাটা গেজেটে একদল মিলিটারি ডাকাতের কথা পাওয়া যায়, যারা ময়দানে ডাকাতি করত। অবশ্য এই ডাকাতি করার ঝক্কি অনেক। ধরা পড়লে ইংরেজদের আইন-কানুন বড্ড কড়া। এমনি একটা লোককে খুন করলে তাঁর আইনে লেখে এক টাকা জরিমানা, কিন্তু ডাকাতি বা রাহাজানি হলে নির্ঘাত ফাঁসি। ১৭৯৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট পাঁচজন সাহেব ও একজন বাঙালিকে ফাঁসি দিয়েছিল ডাকাতির অভিযোগে। ফাঁসি হলেও যেমন তেমন ভাবে নয়। যার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে, তাঁর বাড়ির আশেপাশেই ফাঁসি হবে। এবং যতক্ষণ না মরে ততক্ষন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট তাই রায় দিয়েছিল, Every one of them be hanged by the neck until they and each and every one of them are dead” ফাঁসি না হলে শাস্তি ছিল দ্বীপান্তর কিংবা বেত মারা। দ্বীপান্তর বলতে তখন সাহেবদের জন্য ভ্যান ডায়মন্ডসল্যান্ড, আর এদেশীয় হলে আকিয়াব, মৌলমিন কিংবা প্রিন্স অব ওয়েলস দ্বীপ। দশ আনা চুরির দায়ে রামজয় ঘোষ-কে বড়বাজারের দক্ষিণ কোন থেকে বেত মারতে মারতে প্রকাশ্য রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হল উত্তর কোনে। তারপর আবার উত্তর থেকে দক্ষিণে। অবশ্য ডাকাতিতে লাভই বা হত কত! বড়রকমের ডাকাতি হল রাত ১০ টায় চৌরঙ্গীতে। পালকি চরে যাচ্ছিলেন মিঃ মাসুক। তাকে আক্রমন করে সর্বস্ব নিয়ে গেছে ডাকতরা। সর্বস্ব বলতে তাঁর জূতোর বকলসটা শুধু। কলুটোলায় চৈতন্য দত্তের বাড়ি ডাকাতি হল। জিনিসপত্র বাবদ হিসেব করে দেখা গেল তা পরিমানে ৬০০০ টাকা। যদিও এটা দত্ত মশাইয়ের হিসেব আর খবরের কাগজের হিসেব। এবার মাথা পিছু ডাকাতদের মধ্যে সেটা ভাগ করুন। দেখবেন মাথাপিছু বখরা যা হয় তার থেকে একটা রাইটারও বেশি রোজগার করে কলম পিষে। তাই চুরির থেকে ঋণ করা অনেক সহজ পথ দেখল সাহেবরা। ১৮০২ সালে জেলের মোট কয়েদির হিসেব দেখা যায় ৭২ জন। তার মধ্যে ২৮ জন চোর ডাকাত, আর বাকি ৪৬ জন ঋণগ্রস্থ। ডাকাতদের মধ্যে আবার ১৩ জন ইউরোপিয়ান।          

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...