Skip to main content

বরফ এলো কোলকাতায়!


 আচ্ছা ধরুন আপনি ঠাণ্ডার দেশের মানুষ। সেখান থেকে আপনাকে বদলি করে দেওয়া হল কর্কটক্রান্তির দেশে। তাহলে আপনার মন নিশ্চয়ই চাইবে একটু ঠাণ্ডার স্পর্শ পেতে। তখন আপনার হাতে দুটো উপায় আছে- এক, যেখানে আপনাকে বদলি করা হয়েছে, তার আশেপাশের ঠাণ্ডার জায়গা খোঁজা, অথবা শীতকাল অব্দি অপেক্ষা করা। কিন্তু সে দেশ যদি ভারতবর্ষ হয়, উপরন্তু যদি বাল্যকালের কোলকাতা হয় আপনার বদলির জায়গা, তাহলে উপরের আশাগুলো ছেড়ে আপনাকে ভরসা করতে হবে ঠাণ্ডা পানীয়, থুড়ি পানীয়ের মধ্যে দুই-এক টুকরো বরফের জন্য। গরমের দেশে বসেই কাজ চালাতে হচ্ছে কোম্পানিকে। ঠান্ডার জায়গা বলতে দার্জিলিং তখন ব্রিটিশদের দুরস্ত। কাজেই পানীয়ে ঠান্ডা বরফ মিশিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হচ্ছে তাদের। ১৮১৪ সালের জুলাই মাসের কথা। কোম্পানির দাক্ষিণ্যে হুগলীতে বসানো হল একটা বরফের কল। অধিকাংশ সময়েই সেটা বিগড়ে যায়। তাই চৌরঙ্গীর কিংবা পার্ক স্ট্রিটে সাহেব-কুঠিই হোক, বা হোটেল-রেস্তোরা; বরফ পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। তাছাড়া হুগলী থেকে ৪০ কিলোমিটার পার করে কোলকাতায় সে বরফ আনতে আনতে তার গলনাঙ্ক পার হয়ে যায়। অবশেষে ১৮৩৩ সালের মে মাসে ঘটে গেলো একটা ঘটনা। সবে সকাল হয়েছে। হইচই পড়েছে তখন কোলকাতার এক ঘাটে। বিশাল এক মার্কিন জাহাজ এসে থেমেছে হুগলী নদীর পাড়ে। শিকাগো থেকে চার মাসে শত মাইল পার করে এসেছে কোলকাতাকে ঠান্ডা করতে। জাহাজের পেটে বরফ বোঝাই।  বোস্টনের এক ব্যাবসায়ী ফ্রেডরিখ টিউডরের কৃপায় সুদূর আমেরিকা থেকে “টাককানি” জাহাজে করে সেই বরফ এনেছেন ক্যাপ্টেন রোজারস। প্রায় ১০০ টন রপ্তানি করা হয়েছিল সেই বরফ। গরমের কোলকাতায় ত্রাতা হিসেবে রোজারস এসেছেন কোম্পানিকে ঠান্ডা করতে। সুতরাং তার তো একটা সংবর্ধনা প্রাপ্য। বড়লাট বেন্টিঙ্কের উদ্যোগে টাউন হলে ক্যাপ্টেনকে সংবর্ধনা দেওয়া হল। সাথে বেন্টিঙ্কের উদ্যোগে কোলকাতায় তৈরি হল প্রথম কোল্ডস্টোরেজ। জনসাধারণের চাঁদায় তৈরি হল সেই বরফের গুদামঘর। ১৮৪৭ অব্দি মার্কিন থেকে বরফ রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ৩০০০ টন। সেই বরফ জনসাধারণের মধ্যে বিক্রি হত ১ পাউন্ড ৪ আনায়।  এরপরের সরকার বরফ নিয়ে আরো অনেকদূর এগোলেন। লখনউতে বসানো হল বরফের কল। হুগলীর ফ্যাকটরি ছিল প্রাইভেট সেকটরে, লখনউর বরফ সরকারি কারখানা, পুরোপুরি পাবলিক সেকটারের প্রোডাক্ট। সুতরাং গভরমেন্ট এরপর গর্ব করে বিজ্ঞাপন দিল, Ice is now procurable at the Govt. Manufacturing, Lucknow, at two annas per seer. The Govt. is now in a position to offer this invaluable luxury to the public at a price which defies competition and special attention is invited to the fact, that their principles are small profit and quick returns.
Observe-Two annas per seer only’-Only two annas per seer!”  

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...