Skip to main content

কবরখানার কোলকাতা।


‘ক্যালকাটা আন্ডারগ্রাউন্ড’ বলতেন উইলিয়াম হান্টার। তাঁর মতে মাটির উপরে যেমন, মাটির তলাতেও তেমনই শহরের ইতিবৃত্ত লুকিয়ে আছে। অনেক সাফল্য, অনেক গৌরব। অনেক লজ্জা, অনেক হতাশা। কোলকাতার অতি পরিচিত সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমিট্রি-র কথাই বলা যাক আজকে, একসময় যার নামের সাথেই পার্ক স্ট্রিটের রাস্তার নাম জড়িয়ে ছিল ‘বেরিয়াল গ্রাউন্ড রোড’। এই গোরস্থানের দরজা খোলা হয় ১৭৬৭ সালের ২৫ অগাস্ট, এক সামান্য কেরানিকে সমাধিস্থ করে। ক্রমে সেখানে হতে থাকে অসামান্যদের ভিড়। এই গোরস্থানে শায়িত ডিরোজিও, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পে আর পণ্ডিত উইলিয়াম জোন্সের কবরের কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু এটা অনেকেই জানেন না এখানে শায়িত আছেন কোলকাতার আরও এক কবি টি ডব্লিউ স্মিথ (মৃত্যু ১৮৬৩), আছেন কবি ল্যান্ডরের প্রেমিকা রোজ আইলমার, ‘জুনো’ নামে একটি জাহাজডুবির নায়ক তরুণ নাবিক উইলিয়াম ম্যাকে, যার অভিজ্ঞতা থেকে বায়রন প্রেরণা পেয়েছিলেন ‘ডন জুয়ান’-এ জাহাজডুবির বর্ণনা কে জীবন্ত করতে। আছেন ‘হিন্দু স্টুয়ারট’ অর্থাৎ ভারতীয় স্থাপত্যে ভাস্কর্যে অতি আগ্রহী সেই ছিটগ্রস্থ জেনারেল, যিনি নিত্য গঙ্গাস্নান করতেন, নিত্য দরিদ্রনারায়ন সেবা ছিল যার, এবং যার সমাধি গড়া হয়েছিল হিন্দু মন্দিরের আদলে। যদিও সেটা লুঠেরার দ্বারা লুঠ হয়ে গেলেও কাঠামোটি এখনও আছে। এছাড়া আছেন বারওয়েলের একদা সুন্দরী পত্নী এলিজাবেথ জেন বারওয়েলের সমাধির উপর গড়া বিশাল পিরামিড। অখ্যাত কবরের মধ্যে অনেক মন ভারাক্রান্ত করা ব্যাক্তি; এলিজাবেথ হান্ট (১৮০৪), বয়স ১৮, মিসেস এলিজাবেথ ওলেস (১৮০৫), বয়স ১৭, মিসেস মারগারেট গিবসন (১৮১০), বয়স ১৭, ইত্যাদি ইত্যাদি। কেউ কেউ আছেন যারা সপরিবারে রয়েছেন গোরস্থানে। একটি কবরকে বলা হয় ‘ব্লিডিং গ্রেড’ বা ‘রক্তঝরা কবর’। ১৮০৬ সালে একই বছরে মারা যান জনৈক ডেনিসন, তাঁর স্ত্রী ও তাঁর সন্তানেরা। কথিত যে বছরের একদিন নাকি তাদের কবর থেকে লাল রক্ত চুইয়ে পড়ে। কবরখানাকে অনেকে রহস্য করে বলতেন পাদরির গুদাম। অষ্টাদশ শতকে কাউকে কবরস্থ করা হলে পাদরির দক্ষিণা ২ থেকে ১০ গোল্ড মোহর। যার যেমন মান মর্যাদা, সেই অনুযায়ী দর। তাছাড়া কত নিয়ম তখন; উচ্চপদের কর্মী কেউ হলে ৫০০ টাকা খরচ, তাঁর থেকে নিচু পদের হলে ৩০০ টাকা খরচ। কোম্পানির অফিসারদের আলাদা সারিতে কবর হবে। ‘রাইটার’ কিংবা ‘ফ্যাকটর’ একই সারিতে কবর দেওয়া যাবে না। এছাড়া জাতি বৈষম্য তো আছেই। গোরস্থানের কথা আজকের মতো শেষ করি একজনকে দিয়ে, তিনি হলেন এডওয়ার্ড তিরেত্তো। জাতে ইটালিয়ান। ভাগ্যান্বেষীদের দলে ভিড়ে এসেছিলেন কোলকাতায়। কোলকাতা তাকে নিরাশ করল না। সরকারি পদ পেলেন সুপারিন্টেনডেন্ট অব স্ট্রিটস অ্যান্ড বিল্ডিংস। চিৎপুরের কাছে বাজার কিনলেন একটা, যা এখনও ‘তিরেত্তোর বাজার’ বা ‘টেরিটি বাজার’ নামে খ্যাত। কিন্তু মানুষের সুখের সময় চিরকাল সমান থাকে না। একসময় দেনার দায়ে হাতছাড়া হল বাজার। সাথে বিদায় নিল তাঁর প্রিয় পত্নী এঞ্জেলিকা। ১৭৯৬ সালে তাকে কবরস্থ করা হল বৈঠকখানার পর্তুগিজ গোরস্থানে। কিন্তু সেখানকার কোনোকারনে কমিটির সাথে বিরোধ বেধে গেলো তিরেত্তোর। তখন গোরস্থানের জন্য এক টুকরো জমি কিনলেন পার্ক স্টিটের এই প্রান্তে। স্ত্রীকে বৈঠকখানার কবর থেকে তুলে এনে কবরস্থ করলেন নতুন গোরস্থানে। তিরেত্তো সেদিন ঘোষণা করেছিলেন ইউরোপের যে কোনও দেশের যে কোনও ক্যাথলিকের জন্য খোলা রইল এই গোরস্থানের দরজা।           

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...