Skip to main content

বিলেতি বর, দিশি কন্যা।



সুন্দরী কন্যা বলতে আপনি কি বোঝেন? ফর্সা? তাহলে আপনি একমত হতে পারলেন না পাত্রপক্ষের সাথে। কারন রবিবারের খবরের কাগজে পাত্র-পাত্রীর পাতায় একবার উলটে দেখুন তাহলেই বুঝে যাবেন এই গাত্রবর্ণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য তাদের মধ্যে সকলেই যে অসবর্ণে আপত্তি করে তা কিন্তু নয়। কিন্তু এটা হয়তো একমাত্র আমাদের এখানে বলেই সম্ভব। সেক্ষেত্রে এই গাত্রবর্ণের ব্যাপারটা আমাদেরকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে নটিংহামের ছেলেপুলেরা। তারা ইংল্যান্ডকে ফর্সা রাখতে চায়। কিন্তু কোম্পানির জাহাজ যখন তাদের ওই পোড়া গোবিন্দপুর, সুতানুটিতে নামিয়ে দিয়ে যায়, তখন তাদের মন চলে যায় খিদিরপুরের ক্ষেন্তমনির সেই কালো কুচকুচে মেয়েটার দিকে। ও হল কিনা ডার্ক সাইরেন। কালো মায়াবিনী। এককালে এই রকম বর্ণবৈচিত্রের কারন হিসেবে ইতিহাস বলেঃ ‘We are sure to find something blissful and dear; And that we are far from the lips we love; We make love to the lips that are near’। এরকমই কালো চোখের আগুন দেখেছিলেন চার্নক, পাটনায়। দেশী লোকের জনশ্রুতি যে পাটনায় সাহেব নাকি এক সতীকে চিতা থেকে তুলে এনে নিজের বিবি করেছিলেন। সে ঘটনা সত্যি কি মিথ্যে জানা নেই, তবে তাঁর হিন্দুস্থানি স্ত্রীর কথা ইতিহাসে আছে। মৃত্যুর পর প্রতিবছর সেই বার্ষিকীতে মুরগি জবাই করতেন চার্নক। তবে কোম্পানি তখন সাহেবদের এই অসবর্ণ বিবাহ অত্যন্ত কড়া আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিল। জন লিচল্যান্ড নামে এক সাহেব দেশি বিবি নিতে গিয়ে চাকরি খুইয়েছিলেন। পাঁচ বছর বেকার থেকে শেষে সুরাটে গিয়ে চাকরি পান। যদিও কোম্পানি পরে ঘোষণা করেছিল যে সার্জেন্টের নিচু পদের যারা, তারা দেশি বিবি নিতে পারেন। লেঃ কর্নেল কির্কপ্যাট্রিকের কথা আবার অন্য। নিজাম বাহাদুরের কন্যার পাণিগ্রহণের জন্য ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। মুসলিম হয়ে নাম হল হাসমত জং। তিনি হিন্দুস্থানিদের মতো গোঁফ রাখলেন, হাতে মেহেদি পড়লেন তাঁর দিশি বিবির সন্তান হয়েছিল দুটি। শেষে এই দিশি সাহেব দেহরক্ষা করেন এই কলকাতায়। কির্কপ্যাট্রিকের মতোই কিছুটা কাহিনী মিলে যায় কর্নেল গার্ডনারের। তিনি ঠিক কোম্পানির কর্মচারী ছিলেন না, ছিলেন ফ্রিল্যান্সার। এক দেশীয় রাজার কন্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ঘর বাঁধেন অসবর্ণেই। তাঁর মতো উল্লেখযোগ্য হয়তো সাহেবদের মধ্যে দ্বিতীয় নেই। তিনি নিজের সন্তানদেরও বিবাহ দিয়েছিলেন দেশীয় নবাব, বেগমদের সাথে। এসিয়াটিকা নামে এক সাহেব ১৭৭৪ সালে কলকাতায় শুধু দেশীয় মেয়েদের নিয়ে ঘরই করতেন না, আস্তাবলের মতো হিন্দুস্থানি মেয়েদের নিজের হারেমেও পুষতেন। দ্য বোগে ছিলেন একজন নামকরা ভবঘুরে। শোনা যায় এই ভদ্রলোকও কলকাতায় এসে এক পারস্য মুসলমানীর প্রেমে পড়েন, যদিও নামটা ‘ক্যাথরিন’এ পালটে নিতে ভুললেন না। ১৮০৩ এ ‘ক্যালকাটা গেজেট’এ একটি প্রতিবেদনে পাওয়া যায় যে তালতলা বাজারে একটি বাগানবাড়ি বিক্রি হচ্ছে। বাড়িটি ক্রেতাদের পক্ষে খুব ‘ডিজায়ারেবল পারচেজ’ হবে। কেন না, ওই দামে সেখানে তিনি একটি ‘হিন্দুস্থানি ফিমেল ফ্রেন্ড’-ও পাবেন। বলা বাহুল্য আজ যিনি বাড়ি বিক্রি করে স্বদেশে ফিরে চলেছেন, এই হিন্দুস্থানি মেয়েটি তারই বান্ধবী। কাহিনী বাড়িয়ে আর লাভ নেই। কারন সাহেবদের অসবর্ণ বিবাহে এই মতি ইতিহাসের একটা সামান্য ঘটনা মাত্র। ইতিহাস যত্রতত্র বলে তখনকার কলকাতায় বড় মানুষদের ঘরে, ছোটো মানুষদের বস্তিতে মাঝে মাঝে আবির্ভূত হতেন সাদা মানুষেরা যাদের কারুর আপত্তি ছিল অসবর্ণে।             

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...