দুর্গাপুজোর
মরশুমটা শুধু আনন্দেরই উৎসব নয়, কিছু মানুষের কাছে এটা একটা দুঃস্বপ্নের উৎসবও
বটে। কারন একটাই; বারোয়ারি পুজোর চাঁদা। এমনিতেই বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ।
সুতরাং চাঁদার উৎপাত কোনো মরশুমেই কম নয়। কিন্তু দুর্গাপুজো বাঙালির একমাত্র বড়
উৎসব। কাজেই তার চাঁদার মূল্য ও উৎপাতের পরিমাণও কিঞ্চিৎ বেশি হওয়ারই কথা। অবশ্য
আপনার যদি মনে হয় এই চাঁদার জুলুমের বাড়াবাড়ি এই আধুনিক কালেরই একটা অন্যতম
মাইলস্টোন, তাহলে আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাই কোম্পানির কলকাতায়, মানে মানে যে সময়টা
থেকে বাংলায় বারোয়ারি পুজোর শুরু হল। এই বাঙালি, এই শহর কলকাতা একদিনে কোনোকিছু
শেখেনি। চাঁদার উৎপাত দেখতে দেখতেই বাল্যকাল থেকে বড় হয়েছে কলকাতা। দু-একটা নমুনা
বলা যাক। ১৮৪০ সালের কথা। কলকাতা থেকে পালকি চলেছে বেহালার দিকে। পালকির ভেতরের
সওয়ারিকে ভালো বোঝা যাচ্ছে না কে আছেন ভেতরে, কারন পালকির চারপাশে ভেলভেটের
ঘেরাটোপ, নীচে রেশমি ঝালর। দেখতে দেখতে পালকি এসে পৌছাল বেহালা। সাবর্ণ ,সাথে
সাথেই যেন মাটি ফুঁড়ে এগিয়ে এল কয়েকজন জোয়ান লোক। কি দাবী? না, চাঁদা চাই। পুজো
হবে, বারোয়ারি পুজো। তারা নাকি চৌধুরি বাড়ির ছেলেপুলে সব। কোনোরকম তোয়াক্কা না
করেই পালকির আবরণ তুলে চাঁদা চাইতে গেল ছোকরাদের দল। কিন্তু সর্বনাশ! পালকির ভেতরে
বসে পেটন সাহেব, চব্বিশ পরগণার জেলা-ম্যাজিস্ট্রেট। সাহেবের এই ছদ্মবেশে পালকি
অভিযানের আসল কারন ছিল পুরনো একটা অভিযোগকে যাচাই করে নেওয়া। ‘সমাচার দর্পণ’এ
অনেকদিন ধরে লেখালিখি হচ্ছিল যে বারোয়ারি পান্ডাদের উপদ্রবে বেহালার পথ দিয়ে চলা
দুষ্কর হয়ে উঠছে। বলা বাহুল্য যে তারপর থেকে চৌধুরিদের বাড়ির সেই সব ছোকরাদের
উপদ্রব আর শোনা যায় নি। হুতুম এই সকল বারোয়ারি চাঁদা আদায়কারীদের ‘দ্বিতীয় অষ্টমের
পেয়াদা’র সাথে তুলনা করেছেন। এই সকল বারোয়ারি অধ্যক্ষরা চাঁদা আদায়ের নানান ফন্দি
বের করেছিলেন। একবার এক সোনার বেণের কাছে চাঁদা আদায়ের আশায় গেছিলেন বারোয়ারির
অধ্যক্ষরা। বেণেবাবুর ত্রিশ লক্ষ টাকা কোম্পানির কাগজ ছিল, সুদের কারবারে দশ লক্ষ
টাকা ঘরে আসত। কিন্তু স্বভাবে বড়ই কঞ্জুস। বাবুর একটাই সখ ছিল, একখানা চক্ষু ছিল,
তাও দুটি পরকোলাওয়ালা চসমা ব্যাবহার করতেন। শেষে বারোয়ারি অধ্যক্ষরা বললেন, ‘মশাই,
আপনার বাজে খরচা ধরা পড়েছে, হয় চসমাখানির একখানা পরকোলা খুলে ফেলুন, নয় আমাদের
কিছু দিন’। অনেক কষ্টে শেষে দুটি সিকি আদায় হয়েছিল। অন্য এক ফন্দির কথা হুতুম নিজে
বলেছেন, একবার বারোয়ারি অধ্যক্ষরা সিংহী বাবুকে আপিস যাওয়ার সময় ধরে বসলেন। নিবেদন
করলেন তাদের আজ্ঞা, ‘মহাশয়! আমাদের অমুক জায়গার বারোয়ারি পুজোয় মা ভগপবতী সিংগির
উপর চড়ে কৈলাশ থেকে আসছিলেন, পথে সিংগির পা ভেঙ্গে গ্যাছে; সুতরাং তিনি আর আসতে
পারচ্চেন না, সেই খানেই রয়েছেন; আমাদের স্বপ্ন দিয়েছেন যে যদি আর কোনো সিংগির
জোগাড় করতে পার, তা হলেই আমি যেতে পারি। কিন্তু মহাশ, আমরা আজ এক মাস নানা স্থানে
ঘুরে বেড়াচ্চি, কোথাও আর সিংগির দেখা পেলাম না; আজ ভাগ্যক্রমে আপনার দেখা পেয়েচি,
কোনো মতে ছেড়ে দোবো না- চলুন!’। অতঃপর দশটা টাকা দিয়ে সাহায্য করতেই হল সিংহ
মশাইকে। কোথাও জুলুম, কোথাও কৌশল। একটি শুনুনঃ কলকাতার পশ্চিমে হাওড়ার শিবপুর
গ্রামে এক ব্যাক্তি এক দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করিয়া পুজার তাবদদ্রব্য আয়োজন করিয়া
ঐ প্রতিমাতে লটারি দিয়াছে প্রত্যেক টিকিট একটাকা করিয়া আড়াই শত টিকিট হইয়াছে।
যাহার নামে প্রাইজ উঠিবে সেই ব্যাক্তির নামে সংকল্প হইয়া ঐ প্রতিমা পূজিত হইবেক।
(সমাচার দর্পণ, ১৮২২)। বারোয়ারি পুজোর সেই বারো জন মিলে পুজোর প্রথা আজ বিলুপ্ত
প্রায়। এখন সব পুজোই ‘সার্বজনীন’, অর্থাৎ কিনা সর্ব জন বিদিত। গনতন্ত্রের দেশ,
সবার জন্য হবে না তো কি! সার্বজনীন বলেই না ছাপোষা মানুষটাকে ত্রিশ জায়গায় চাঁদা
দিয়ে যেতে হয়। অবশ্য ইদানীং কালে শুধু প্রতিমা আর মন্ডপ দেখা ছাড়া দুর্গাপুজো কি
আর সত্যি সার্বজনীন? ভেবে দেখুন একবার।
‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

Comments
Post a Comment