বাঙালির যতগুলো জিনিসকে ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়, তাদের মধ্যে
মাধ্যমিক অন্যতম। অবশ্যই জীবনে পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম Larger than life। তাই তো কপালে ঘাম,
পেট গুড়গুড়, ঘন ঘন ক্ষিদে পাওয়া এসব তো হবেই। আর এই ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’টা যতটা
না ছাত্রের, তার থেকেই দ্বিগুন পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে ছাত্রের অভিভাবকদের কাছে। আপনি
বাঙালি হলে অবশ্যই মানবেন কথাটা। কারণ মাধ্যমিক পরীক্ষার একবছর থুড়ি দুবছর আগে
থেকে অর্থাৎ কিনা ক্লাশ নাইন যখন, তখন থেকেই বাবা-মা এই মিশনের ট্রেনিং দেওয়া শুরু
করেন। তবে এই ট্রেনিং-এর বহর দেখলে ওই ফোর্ট উইলিয়ামে থাকা সেনাদের ট্রেনিং-ও
নগন্য মনে হবে। আর মা-বাবার একমাত্র সন্তান হলে তো কথাই নেই। আর নতুন প্রজন্ম
বাঙালিদের কাছে এটা আজকাল একটা সাবেকিয়ানায় এসে ঠেকেছে। ‘ছাত্রের জীবন বিজ্ঞানটা
একটু কাঁচা, তাই টিউশনে দিলাম স্কুলের ব্যাচে’, আচ্ছা দিন। দু মাস ঘুরতে না
ঘুরতেই; ‘এই ব্যাচে ঠিক কম্পিটিশনটা ভালো হচ্ছে না। অমুক স্যারের ব্যাচে দি। সব
ভালো ভালো স্টুডেন্টরা পড়ে’। হল; জীবন বিজ্ঞানের জন্য দুটো। ঠিক এক মাস ঘুরতে না
ঘুরতেই ছাত্র সকালে ঘুম ভেঙে দেখবে তার পড়ার ঘরে নবাগত জীবন বিজ্ঞানের প্রাইভেট
টিউটর দন্ত বিকশিত করে বসে আছে। ‘না মানে ছেলেটা না ঠিক ব্যাচে পড়াটা বুঝতে পারছে
না, তাইজন্য বাড়ির প্রাইভেট টিউশনটা দরকার’, ছাত্রের অভিভাবকের বক্তব্য। পরীক্ষার
দিন যত এগোয় এই সব বাঙালি জীবদের বহিঃপ্রকাশ তত হতে দেখা যায়। হ্যাঁ জীবই বটে! অবশ্যই
সে তালিকায় প্রথম আসেন অভিভাবক। স্কুলের গেটের বাইরে থেকে স্যারের পড়ার ব্যাচের দরজার
সামনে, সর্বত্র এদের বিচরণ। মুখে একটা ‘বিগলিত করুণা যাহ্নবী যমুনা’ ধরনের হাসি,
একটা বিশুদ্ধ গদগদ ভাব। আর ঘুণাক্ষরে যদি সেই বেচারা প্রানী অর্থাৎ কিনা টিউশনের
স্যার তার বা তাদের মুখোমুখি হয়ে যান, ব্যাস! তাহলেই চিত্তির। বিশ্বাস করতে কষ্ট
হবে, অভিভাবক যত না অভিযোগের পসরা নিয়ে স্যারের কাছে উপুড় করবেন, তত অভিযোগ এবারের
লোকসভা ভোটে নির্বাচন কমিশনও পেয়েছে কিনা সন্দেহ! আর সবশেষে সেই পেটেন্ট হাসি হেসে
অভিভাবকের চিরাচরিত বানীটা ঝাড়বেন, ‘স্যার আমার ছেলেটাকে বা আমার মেয়েটাকে একটু
দেখবেন’। আর শিক্ষার্থী যদি মেয়ে হয়, তাহলে স্যারের পক্ষে সে মেয়েকে বেশি দেখলে
মুশকিল। সময়টা তো ভালো যাচ্ছে না ৮ বছর হল। স্কুলের স্যাররা তাও অনেক ক্ষেত্রে
এসবের থেকে পার পেয়ে যান যেহেতু তারা একটা ঘরের মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকেন এইসকল
জীবেদের হাত থেকে বাঁচতে। আর সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এই মে-জুনের গরমে দাঁতে
হিটকি দিয়ে পড়ে যাবে, তবু মাটি কামড়ে স্কুলের বাইরের গেট ধরে বসে থাকবে এইসকল
অভিভাবকরা; কখন তার ‘আদরের সোনা’ বেরোবে, তার থেকে স্কুলের হোমওয়ার্ক, পড়া পারল
কিনা, কটা কোশ্চেন ছেলে করে এল, ছেড়ে এল, কেন ছাড়ল, তার মানে ওই টিচার করায়নি,
আজকেই বাড়ি গিয়ে ছাড়িয়ে দেব.........গুস্টির তুষ্টি জানতেই হবে তক্ষনই। নিদেন
পক্ষে বাড়ি যাওয়ার আগে সেসব না জানতে পারলে ছেলের জ্ঞানের রেটটা, নিজের প্রেস্টিজ,
নিজের সন্ধ্যেবেলা ‘অমুক বউ’ সিরিয়াল না দেখে স্যাক্রিফাইস করা - এসবই স্টক
মার্কেটের মতো পপাত চ হবে যে! এসব সাতপাঁচ ভাববেন নিজে, আর বলির পাঠা হবে সেই
রামপাঠাটা, যে শুধু অভিভাবকের কথায় ‘হ্যাঁ’ তে ‘হ্যাঁ’, ‘না’ তে ‘না’ করে বিষয়
পিছু ৪জন, ৫ জনের কাছে পড়ে যাচ্ছে। এখন টিউশনে ভরতি করা বা প্রাইভেট টিউটর দেওয়া,
এসব এখন জ্ঞান অর্জনের দেওয়া হয় না। এসব এখন দেওয়া হচ্ছে ওই তাকে যেমন দামী জিনিস
সাজিয়ে রাখে, সেরকম ভাবে দামী টিচার সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। এখন এসব পড়ে অনেকে রে রে
করে তেড়ে আসবেন, বলবেন ‘অভিভাবকদের কষ্ট কি বুঝিস, অভিভাবকের তার মানে কোনো অবদানই
নেই, তাদের স্যাক্রিফাইস কিচ্ছু বুঝবি না তোরা’! নাহ, আমরা বুঝব না, বুঝবে পাশের
বাড়ির কাকুর ছেলেটা! একটা ছাত্রকে তৈরি করার পেছনে যে অভিভাবকের অবদান যে সবার আগে
সেটা আমরা সবাই বুক ঠুকে মানি। কিন্তু এখন, ইদানিং কালে যে চিত্রটা দেখা যাচ্ছে,
সেটাকে কি মানা যায়? নিজের মনকে নিজে থেকে প্রশ্ন করে দেখবেন। এতক্ষন যা বললাম
সেটা বাঙালির একটা মহাদোষ হিসেবে বর্ণনা করলাম, কিন্তু সেটা অতি সত্যিকথা। পছন্দ
না হলে নিজের স্ক্রিনের উপর পচা টমেট্যো বা ডিম ছুঁড়ে মারতে পারেন। ধন্যবাদ।
‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

Comments
Post a Comment