Skip to main content

শ্রীরামপুরের সমাচর দর্পণ



সংবাদপত্র যে মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে একটা যুগান্তকারী মাধ্যম, বলাবাহুল্য একটা অস্ত্র; সেকথা আজকের দিনে সকলেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। বিশেষ করে বাংলা সংবাদপত্র। বাংলা সংবাদপত্রের সূচনা যে কবে হয় সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেক তর্ক বিতর্ক আছে। তবে ব্রিটিশ শাসনভুক্ত অবিভক্ত বাংলায় শ্রীরামপুরের ‘সমাচর দর্পণ’ আর গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের ‘বাঙ্গাল গেজেটি’ এই দুটি সংবাদপত্রকেই সবথেকে পুরনো বাংলা সংবাদপত্র হিসেবে সম্মান করা হয়। এই পর্বে আসি ‘সমাচর দর্পণ’ নিয়ে কিছু কথায়। ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাস। শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশনারিরা ‘দিগদর্শন’ নামে এক বাংলা মাসিকপত্র প্রকাশ করে। এটিই ছিল বাংলার প্রথম মাসিকপত্র। আর এর কিছুদিন যেতে না যেতেই ২৩শে মে ‘সমাচর দর্পণ’-র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সম্পাদক ছিলেন জে সি মার্শম্যান। আসলে প্রথম দিকে ‘দিগদর্শন’ মাস দুই প্রকাশ করার সংকল্প থাকলেও সে মাসিকপত্র জনপ্রিয় হয়নি। তাই জন্যই ‘সমাচর দর্পণ’ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। প্রথম ‘সমাচার দর্পণ’-এ প্রতি সপ্তাহে ছাপানোর মতো বিষয়বস্তু হিসেবে থাকত- ১। এ দেশের জাজ, কালেক্টর ও রাজকর্মচারীদের কাজকর্ম, ২। যা যা নতুন আইন কানুন চালু হবে তার খবর, ৩। ইংল্যান্ড ও ভারতের নানাবিধ খবর, ৪। বাণিজ্যের বিবরণ, ৫। জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহের ক্রিয়া, ৬। ভারতের প্রাচীন ইতিহাস, ব্যাক্তি ও পুস্তক সংক্রান্ত খবর। প্রত্যেক শনিবার প্রকাশিত হত এই ‘সমাচার দর্পণ’ যার মূল্য ছিল প্রতি মাসে দেড় টাকা। যদিও প্রথম দুই সপ্তাহের ‘সমাচার দর্পণ’ মিলত বিনামূল্যে। মার্শম্যান নামে সম্পাদক হলেও আসলে এই পত্রিকা চালাত দেশীয় পন্ডিতেরা। প্রথম দিকের ‘সমাচার দর্পণ’-র দেশীয় সম্পাদক ছিলেন পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার। এরপর সম্পাদনায় চার বছর সাহায্য করেছিলেন পণ্ডিত তারিণীচরণ শিরোমণি। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে বাঙালিদের মধ্যে যে ইংরেজি শেখার বিপুল সাড়া পড়ে, সে জন্যই শ্রীরামপুর মিশন ১৮২৯-এর ১১ই জুলাই থেকে ‘সমাচর দর্পণ’-কে দ্বিভাষিক সংবাদপত্র হিসেবে প্রকাশ করতে থাকেন। এতদিন অব্দি প্রতি শনিবার এই পত্রিকার প্রকাশিত হলেও ১৮৩২ থেকে সপ্তাহে দুবার এর প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১১ই জানুয়ারী, ১৮৩২; বুধবার এই পত্রিকার অতিরিক্ত সংখ্যা প্রকাশিত হয়। যদিও পরে ডাকমাশুল বেড়ে যাওয়ার জন্য ১৮৩৪র ১৮ই নভেম্বর থেকে আবার সপ্তাহে শনিবার করে দেখা দিতে থাকে ‘সমাচর দর্পণ’। ১৮৪১ এ মার্শম্যান অন্যদুটি পত্রিকা ‘ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’ ও ‘গভর্নমেন্ট গেজেট’-এর সম্পাদনার দায়িত্ব এসে পড়লে ‘সমাচর দর্পণ’ থেকে হাত তুলে নেন। ১৮৪১এর ২৫শে ডিসেম্বর এর শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। কিন্তু ১৮৪২এর জানুয়ারি মাসে সম্পাদক ভগবতীচরণ চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগে আবার নতুন করে প্রান ফিরে পায় ‘সমাচার দর্পণ’, তার দ্বিতীয় পর্যায়ের সংখ্যা প্রকাশিত হয়ে। যদিও শেষ অব্দি সেটাও অল্প কদিন চলার পর বন্ধ হয়ে যায়। আবার ৩ মে, ১৮৫১। পুনরায় শ্রীরামপুর মিশনারিদের উদ্যোগে চালু হল পত্রিকা। এবারের মেয়াদ স্রেফ দেড়বছর। ১লা বৈশাখ, ১২৬০ (১২ এপ্রিল, ১৮৫৩) তারিখে ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ খবর বেরল- “অগহায়ণ, ১২৫৯, সমাচর দর্পণ শ্রীরামপুর গঙ্গার জলে প্রান ত্যাগ করে”।                  

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...