Skip to main content

ছদ্মবেশী বিপ্লবী।


ভারতবর্ষের বিপ্লবের ইতিহাসে যদি ছদ্মবেশে দেশ ছেড়ে পালানোর কথা বলা হয়, সবার প্রথমেই বাঙালি নাম করবে শ্রীযুক্ত সুভাষচন্দ্র বসুর। কিন্তু তাঁর মহানিষ্ক্রমণের ঘটনা আমাদের কাছে আক্ষরিক অর্থে highlighted। সেজন্যই হয়তো একথা প্রায় বাঙালি এখন ভুলতে বসেছে যে এই সুভাষচন্দ্ররই অন্যতম গুরু রাসবিহারী বসুও এককালে ইংরেজদের চোখে ধুলো দিয়ে দেশ ছেড়ে জাপানে পৌঁছেছিলেন দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন নিয়ে। অবশ্যই সুভাষচন্দ্রের মহানিষ্ক্রমণ ইতিহাসের কাছে অন্যতম Great escapeএর উদাহরণ। কিন্তু নানাভাবে নানাবেশে, বারংবার পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে রাসবিহারী যেভাবে নিজের বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে গেছিলেন, তা হয়তো সেভাবে বাঙালিদের মধ্যে glorify হয় না। মূলত তাঁর মতো এরকম এত ছদ্মবেশ নেওয়া হয়তো ভারতবর্ষের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের মধ্যে বিরল। মূলত রাসবিহারী বসু তখন দেরাদুনে কর্মরত একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের হেড ক্লার্ক। সারা ভারতবর্ষের কাছে তাঁর নাম প্রথম উঠে আসে ১৯১২ সালের ২৩শে ডিসেম্বর, দিল্লীতে লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর উপর বোমা ফেলার ঘটনায়। এই পরিকল্পনার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন রাসবিহারী বসু। সেই থেকে বাঙালি থেকে গোটা ভারতবর্ষের বিপ্লবীদের কাছে মহাগুরু হয়ে উঠলেন এই চন্দননগরের এই দামাল ছেলে। বিপ্লবের প্ল্যানিং থেকে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যাওয়া; কখন কোথায় কিভাবে কাজ হবে, পুলিশ আসার আগেই কোথায় কারা পালাবে, কি ছদ্মবেশ নেবে- এসবেতেই ছিল তাঁর নির্ভুল হিসেব। দিল্লীর বোমা মামলায় পুলিশ তখন হন্নে হয়ে রাসবিহারীকে খুঁজছে। খুঁজতে খুঁজতে দেরাদুনে রাসবিহারীর বাংলোতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে এল। কিন্তু এসে তারা অবাক! বাংলোর দরজা জানলা খোলা, রাসবিহারী পালিয়ছেন ছদ্মবেশে। গ্রেপ্তারীর পরোয়ানা বেরলো; রাসবিহারীর মাথার দাম উঠল সাড়ে সাত হাজার টাকা। কিছু রাজামহারাজারা রাসবিহারীর দাম ঘোষণা করলেন এক লক্ষ টাকা। কিন্তু ১৯১২ পর থেকে তাঁর কোনো চিহ্ন পেল না পুলিশ। গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর- দিল্লী, লাহোর, কানপুর, বেনারস, অমৃতসর, পাটনা, কোলকাতা, চন্দননগর; কোত্থাও নেই রাসবিহারী। মাঝে পুলিশের মধ্যে আশার আলো জ্বলে উঠল; খবর এল রাসবিহারী গা ঢাকা দিয়ে আছেন বেনারসে। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ছুটল তাঁকে ধরতে। গোটা বাড়ি ঘিরে ইনস্পেক্টর নির্দিষ্ট বাড়িতে ঢুকল। কিন্তু বাড়িতে কেউ নেই। শুধু একজন উড়ে ঠাকুর রান্না করছেন। ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল রাসবিহারী আছেন উপরের ঘরে। পুলিশ সেই কথা মতো তল্লাশি নিল বাড়ির দোতলায়। কিন্তু কই? কোত্থাও কেউ নেই। ইনস্পেক্টর ভাবলেন উড়ে ঠাকুরটাকেই ভালো করে জেরা করতে হবে। কিন্তু ততক্ষনে সেই উড়ে ঠাকুরও ভাগলবা! রান্নাঘরও ফাঁকা! ইনস্পেক্টরের বুকটা ধুক করে উঠল- ‘তবে কি ওই উড়ে ঠাকুরই......’। একদমই তাই; উড়ে ঠাকুরের ছদ্মবেশে ততক্ষনে প্রস্থান করেছেন রাসবিহারী। আর একবার কোলকাতার পুলিশের সদর দপ্তরে খবর এল চন্দননগরে রাসবিহারী এসেছেন। টেগার্ট-এর বাহিনী ছুটল তাঁকে ধরতে; এবার যেন কোনো ভুল না হয়। কিন্তু গিয়ে এবারেও দেখা পেলেননা তাঁর। গোটা বাহিনীর পাশ কাটিয়ে সামান্য এক মেথরের সাজে, সঙ্গে জিনিস বলতে স্রেফ একটা বালতি আর একটা ঝাঁটা। এইভাবে চলল দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। রাসবিহারীর তখন কত পরিচয়। কখনও তিনি ফ্যাটবাবু, কখনও চুচেন্দ্রনাথ, কখনও বা সতিশচন্দ্র, আবার কখনও বা মাড়োয়ারী বা পাচক বা মেথর। এই বিচিত্র ছদ্মবেশী বিপ্লটিকে যে চিনে কেউ বের বের করবে, সেরকম সারা ব্রিটিশ সামাজ্যে কেউই নেই। শুনে মনে হবে রাসবিহারী শুধু পালাচ্ছেন। আসলে পালাচ্ছেন না, তিনি এর মধ্যেই পরিকল্পনা করছেন একটা বড়সড় বৈপ্লবিক আক্রমণের। দেখতে দেখতে চলে এল ১৯১৪। প্ল্যান করলেন ভেতরে ভেতরে সমস্ত ভারতীয়কে ক্ষেপিয়ে দিতে হবে; সিভিল, মিলিটারি সব ক্ষেত্রে। লাহোরে বৈপ্লবিক প্রচার করার সময় আবার নিলেন ছদ্মবেশ; এবার এক নবদম্পতি। সহযোগিতা করলেন বিপ্লবী রামশরণ দাসের স্ত্রী। কিন্তু এত নিখুঁত পরিকল্পনা সত্ত্বেও কৃপাল সিং-এর বিশ্বাসঘাতকতায় ভেস্তে গেল বিপ্লব। শুরু হল লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। পুলিশ প্ল্যানের মাথা হিসেবে আবার গ্রেপ্তার করতে এলেন রাসবিহারীকে। কিন্তু এবারেও তারা ব্যার্থ। ১৯১৫ সালের ১২ই মে খিদিরপুর বন্দর থেকে সানুকি-মারু জাহাজে চড়ে জাপানে চলে যান তিনি। যাওয়ার আগে পাসপোর্ট অফিস থেকে নিজের পাসপোর্ট করান; এবারেও ছদ্মনাম ও ছদ্মবেশ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয় রাজা প্রিয়নাথ ঠাকুর ওরফে পি এন ঠাকুর নাম নিয়ে দেশ ত্যাগ করেন রাসবিহারী। এরপরে জাপানে তাঁর তৈরি আজাদ হিন্দ ফৌজ, নেতাজির অধিনায়কত্ব- এসবই সবার কাছেই পরিচিত। এর মাঝে আরোও একটি অন্য ইতিহাস আছে। ১৯২৬ সালের অগাস্ট মাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি বিখ্যাত উপন্যাস প্রকাশিত হয়, যা সেসময় ব্রিটিশ ভারতে নিষিদ্ধ হয়। সেই ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিপ্লবী সব্যসাচীকে যারা যারা জানেন, তারা কি কোথাও গিয়ে ভারতত্যাগী এই বাঙালী বিপ্লবীর কর্মকাণ্ডের সাথে মিল পান? কিংবা ‘সব্যসাচী’ সিনেমার উত্তমকুমারের চরিত্রটি সাথে রাসবিহারীর ছদ্মবেশ নেওয়ার নিপুণতায়? সেকথা আপনারা বিচার করুন পাঠকগণ!                   

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...