Skip to main content

শঙ্করের ‘চৌরঙ্গী’ নাকি আজকের ‘শাহজাহান’?


“শঙ্করে চৌরঙ্গী পড়েছেন? আমার গল্পটা হল চৌরঙ্গীর জাতিস্বর”। কথাগুলো আমার নয়। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের নতুন সিনেমা ‘শাহজাহান রিজেন্সি’র মূল বক্তার সংলাপ এটি। কিন্তু যারা শঙ্করের চৌরঙ্গী পড়েছেন, তাঁরাও এই সিনেমাটি দেখলে বুঝবেন যে সংলাপটির আদৌ কোনো সত্যতা নেই। অর্থাৎ এক্কেবারে ঢপ। সিনেমাটির কাটাছেড়া করার জন্য দুধরণের দর্শক আছেন; এক- যারা ‘চৌরঙ্গী’ পড়েছেন, আর দুই- যারা ‘চৌরঙ্গী’ পড়েননি। আরও একধরনের দর্শক আছেন যারা বিশ্বাস করেন উত্তমকুমারের সাদাকালোর ‘চৌরঙ্গী’কে। যাক গে, সে প্রসঙ্গে অন্যদিন আসা যাবে। প্রথমে আসি যারা ‘চৌরঙ্গী; আদ্যান্ত উপন্যাসটি পড়েছেন। তাদের ক্ষেত্রে এই সিনেমা চূড়ান্তভাবে হতাশ করবেই করবে। প্রথমত, শঙ্করের উপন্যাসটি স্বাধীনতার আগের প্রেক্ষাপটে লেখা। তাই সেইসময়ের চৌরঙ্গী চত্বরের হোটেলের পরিবেশ, বারের আসা ব্যাক্তিসমূহের উদ্দামতা সেইসব স্বাদের এই সিনেমায় অনেক অনেক অভাব। পুরনো গল্পকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে এনে সেটা নিয়ে সিনেমা করা বেশ দক্ষতার কাজ। একবার যদি কোনো এক জায়গায় সেই দক্ষতার বিচ্যুতি ঘটে, তাহলে আস্তে আস্তে সেই সিনেমার তাল কাটতে শুরু করে। ‘শাহজাহান রিজেন্সি’র ক্ষেত্রেও তাইই হয়েছে। আধুনিকতার খাতিরে উপন্যাসের চরিত্রের সামান্য রদবদল ঘটেছে; যেমন ‘স্যাটা বোস’ হয়েছে ‘স্যাম বোস’ (আবির চট্টোপাধ্যায়), হোটেল মালিক ‘মার্কোপোলো’ হয়েছে ‘মকরন্দ’ (অঞ্জন দত্ত), গোয়েন্দা ‘বায়রন’ হয়েছে ‘বরুন’ (রুদ্রনীল ঘোষ) আর উপন্যাসের লেখক স্বয়ং ‘শঙ্কর’ এখানে হয়েছেন ‘রুদ্র’ (পরম্ব্রত চট্টোপাধায়)। পরিবর্তন আরো অনেক এসেছে, যেমন মূল গল্পে স্বাধীনতাপূর্বক হোটেলে যে ব্যান্ডপার্টির আয়োজন থাকত, তার বদলে এখানে এসেছে সুরবাহার বাদক (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)। হোটেলের স্যুইটের দেখাশুনার দায়িত্বে আছেন ‘কমলিকা’ (স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়), উপন্যাসে যে চরিত্রের নাম ছিল ‘করবী’। এই অব্দি ব্যাপারটা ঠিক ছিল। কিন্তু মুশকিলটা শুরু হয় গল্পের বাঁধুনির থেকে। আদপে ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস বাংলা উপন্যাস জগতে এক মহাকাব্যের মতো। এবার সেটাকেই যদি ২ ঘন্টা ১৫ মিনিটে পর্দায় তুলে ধরতে যান পরিচালক, তাহলে যা সাড়ে সর্বনাশ হওয়ার তাই হয়। অর্থাৎ গল্পের কোনো একটা প্লট ঠিকমতো প্রতিস্থাপন করার আগেই দ্বিতীয় প্লটে দ্রুত চলে গেছেন পরিচালক। প্রেক্ষাপটের পর প্রেক্ষাপট পরিবর্তন। সোজা কথায় বড্ড তাড়াহুড়ো করেছেন গোটা গল্পটা বলতে গিয়ে। এতগুলো চরিত্র, তাদের সাথে হোটেলটা কিভাবে জড়িয়ে রয়েছে, কিভাবে ‘শাহজাহান’ হাত বদল হচ্ছে, এসব স্পষ্ট করে দেখানোর অনেক অবকাশ থাকলেও কেন যে দেখানো হয়নি তা মা গঙ্গাই জানেন। কারন সিনেমার দীর্ঘতা কম নয়। আসলে পরিচালক নিজেই বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে গিয়ে একবার ভেবেছেন পুরনো গল্পকে আধুনিক সময়ে টেনে আনতে। পরক্ষনেই মনে করেছেন যে না, সময়টা আধুনিক হলেও উপন্যাসে বর্ণিত পুরনো সঙ্কীর্ণতাকে দেখানো উচিৎ। তাই আধুনিক সময়ে যে সমকামিতা, উচ্চশ্রেণীর হোটেলে বারবনিতা পোষা ইত্যাদি আর কারুর কাছে অজানা নয়- এসবই বক্তা ওরফে ‘রুদ্র’র কাছে নতুন লাগে। গোটা সিনেমা জুড়ে তিনি শুধু ‘এসব হয় এখানে? ইই মাআ!’ এই গোছের অভিনয় করে গেছেন। তা বলে কি সিনেমার ভালো বলে কিছু নেই? অবশ্যই আছে, সিনেমার প্রেক্ষাপটের সাথে তাল মিলিয়ে সঙ্গীতের ব্যাবহার বিশেষ করে গানগুলি, চিত্রগ্রহণ- এগুলো বেশ ভালো। দু একটি দৃশ্য সত্যি মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো, যেখানে হোটেল শেষে একে একে সবাই বিদায় নিতে থাকে, হোটেলের মালিক মকরন্দ নিজের সাম্রাজ্য পতনের দিকে তাকিয়ে থাকেন- এই দৃশ্যগুলী যথাযথ। অভিনয়ের কথায় আসতে গেলে আবির চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, রুদ্রনীল ঘোষ, মমতা শঙ্কর, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, কাঞ্চন মল্লিক, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় কারুর অভিনয়ই মনে দাগ কাটার মতো নয়। অথচ প্রত্যকের পর্দায় যতটুকু উপস্থিতি আছে, তাতে আরও অনেক অভিব্যাক্তি বেরিয়ে আসার কথা। কিন্তু ঐ যে বললাম পরিচালক নিজেই বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন যে কোথায় কাকে ও কোন জিনিস কতটা দরকার! কাজেই যারা ‘চৌরঙ্গী’ পড়েছেন তাদের ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ বেশ হতাশজনক সিনেমা। যারা ‘চৌরঙ্গী’ পড়েননি, তাদের কাছে? টাকা আপনার, নেট আপনার, সময় আপনার! আপনি যেভাবে খুশি ব্যাবহার করুন। বাকিটা বুঝে নেবেন!                       

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...