Skip to main content

ফেলুদা ফিরলেন 'ফেলুদা ফেরত'-এ।


কিভাবে যে এই আলোচনাটা শুরু করি, সেটাতেই confused ফেলুবাবু। মানে প্রথমবারের দর্শনে টানা আড়াইঘন্টা শুধু মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বাঙালীর Evergreen Trioকে দেখলাম। আর দ্বিতীয়বার দেখলাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার জন্য। সত্যি বলতে কি সৌমিত্রবাবুর 'ফেলুদা'র পর সেই বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা 'ফেলুদা'কে খুব miss করতাম। কিন্তু দীর্ঘ বহুবছর পর সেই বইয়ের পাতা থেকে 'ফেলুদা'কে আবারও উঠে আসতে দেখলাম সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় 'ফেলুদা ফেরত'এ। সত্যজিৎ রায়ের 'ছিন্নমস্তার অভিশাপ' অবলম্বনে তৈরি প্রথম সিজনের ফেলুদাতে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন পরিচালক। গল্প নিয়ে নতুন করে বলার কিছু থাকে না। গল্পের 'কান্ডারি'-করকে কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। আর যদি visualisationএর ব্যাপারে আসি, তাহলে এককথায় তা অনবদ্য। প্রথমত পরিচালক মশাই এই গল্পের প্রেক্ষাপটকে সেই ৭০এর দশকেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, তার একটাই কারণ গল্পের অরিজিনাল নস্টালজিয়াকে ধরে রাখা। আর দ্বিতীয় কারণটা নিন্দুকদের জন্য বলে রাখা ভালো যে এই গল্পকে কখনই আধুনিক সময়ে আনা যেত না তার কারণ সার্কাসে পশুপাখি, বিশেষ করে বাঘের খেলা দেখানো বন্ধ হয়ে গেছে আজ বহুবছর। এবার আসি সিরিজের বাকি বিভাগে। প্রথমে অভিনয়ের ব্যাপারে আসতে হয় ফেলুদা হিসেবে টোটা রায়চৌধুরীকে। সন্দীপ রায়ের 'টিনটোরেটোর যীশু' যখন বেরিয়েছিল, তারপরের সন্দীপ রায়ের খুব জল্পনা করেছিলেন তার পরবর্তী ফেলুদা হিসেবে টোটাকেই নেবেন। সুতরাং টোটাকে যে ফেলুদা হিসেবে অসাধারণ মানাতে পারে, তা অনেক বছর আগেই কল্পনা করা হয়েছিল। প্রথম দুটো এপিসোডে টোটা সামান্য আড়ষ্ট হলেও তারপরের এপিসোডগুলো থেকে তিনি শুধু ৪ আর ৬ মেরে গেছেন। মানে অসাধারণ অভিব্যক্তি ফেলুদা হিসেবে, আর অবশ্যই ফেলুদার সেই প্রখর দৃষ্টি। দ্বিতীয় যার কথা বলতে হয় তিনি হলে জটায়ু হিসেবে অনির্বাণ চক্রবর্তী। I am just speechless ওঁনাকে দেখে। মানে 'কোথায় ছিলেন মশাই এতদিন'! সন্তোষ দত্ত হয়তো তিনি নন (বোকা নিন্দুকের মতো বারবার comparisonএ যাবো না), কিন্তু তিনি সত্যজিৎ-এর বইয়ের হুবহু জটায়ু হয়ে উঠেছেন একদম গোড়ার দৃশ্য থেকেই। কিন্তু সমস্যা হয়েছে এদের দুজনের মাঝে পড়ে বেচারা কল্পন মিত্র অনেকটা ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে তোপেশে হিসেবে। এছাড়া গল্পের বাকি চরিত্রায়ণে ধৃতিমান, সমদর্শী, অরিন্দম গাঙ্গুলী, ঋষি কৌশিক- প্রত্যেকে এক্কেবারে perfect। এবারে যদি আসি বাকি technical partএ তাহলে প্রথমে যার প্রশংসা করতে হয় সেটি হল ক্যামেরার কাজ। মোহময় জঙ্গল, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সহায়ের বাংলো থেকে বাঘের ডাক শোনার দৃশ্য কিংবা নদী পেরনোর অংশ- এককথায় 100 percent outstanding। আর এই ক্যামেরার কাজকে আরও boost up করেছে জয় সরকারের অসাধারণ BGM আর এডিটর মশাইয়ের এডিটিং। শুধু মহেশবাবুর নিজের বাড়ি ঘুরিয়ে দেখানোর সময় কিছু description দিলে ওই অংশটি এত boring লাগত। যদি এই সিরিজের দুর্বলতা যদি কিছু থেকে থাকে, তা হল বাঘের VFXটি। কিন্তু 'সবার উপর গল্প সত্য, তাহার উপর কিছু নাই'। নাহলে হলিউডে গাদা গাদা VFXএ খরচ করেও অনেক সিনেমা ফ্লপ করে কেন। যাই হোক, ফেলুদা নিয়ে একবার কথা বলতে বলতে শেষ করতে ইচ্ছে করে না। তবুও শেষ করতে হবে সিজন ২এর অপেক্ষায়। সবকথা এখানেই শেষ করে দিলে কাঠমান্ডু যাওয়ার ভিসা পাবো না। 

অপেক্ষায় রইলাম ১৯৭৭এর পর ২০১৯র ফেলুদাকে কাঠমান্ডুতে দেখার জন্য। সাথে আরও একবার ধন্যবাদ পরিচালকমশাইকে, তার কারণ আমরা পঞ্চকেরই শিষ্য যারা উত্তরের জানলা খুলে নতুন ফেলুদাকে স্বাগত জানিয়েছি, কোনোরকম পুরনোকে আঁকড়ে না ধরে থেকেই।

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...