সংবাদপত্রের দায়িত্ব কি শুধু চটকদার খবর প্রকাশ করা, নাকি নিজেদের প্রেসের লাভজনক ব্যাবসার উপরেও কোনো দায়িত্ব থেকে যায়? আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে খুবই প্রাসঙ্গিক লাগতে পারে কথাটা যে একটা রাষ্ট্রের গঠনমূলক কাজে সংবাদপত্রের ভূমিকা ঠিক কতটা। আর বিশেষ করে সেটা যদি কোনো পক্ষপাতহীন সংবাদমাধ্যম হয়। যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভালো-মন্দ দিক তুলে ধরার পেছনে সেই রাষ্ট্রের পক্ষপাতহীন গণমাধ্যম যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার নিদর্শন হিসেবে দেখা গেছে স্টিভেন স্পিলবার্গের 'দ্য পোস্ট'এ। ঘটনার প্রেক্ষাপট শুরু হয় ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের মিলিটারি অ্যানালিস্ট ড্যানিয়েল এলসবার্গের (ম্যাথু রেস) মাধ্যমে, যাকে ১৯৬৬তে পাঠানো হয় ভিয়েতনামের যুদ্ধক্ষেত্রে আমেরিকার সমর-উন্নতির বিশ্লেষণের রিপোর্ট করার জন্য। কিন্তু ভিয়েতনাম থেকে দেশে ফেরার পথেই সরকারি বিমানেই যুদ্ধের আসল ব্যাপার খোলসা করে দেন ডিফেন্স সেক্রেটারি রবার্ট ম্যাকনামারা (ব্রুস গ্রিনউড) যে আদতে এই ভিয়েতনামের যুদ্ধ একটা ধোঁকার টাটি আর তার খেসারত আমেরিকান সেনাবাহিনীকেই দিতে হচ্ছে। এর ঠিক একবছর পর 'র্যান্ড কর্পোরেশন' (মিলিটারি ডিফেন্স থিংক ট্যাঙ্ক)-এ চাকরিরত এলসবার্গের হাতে চলে আসে আমেরিকান ডিফেন্সের ক্লাসিফায়েড কিছু তথ্য যার সারমর্ম এই যে রাষ্ট্র রাষ্ট্রের স্বার্থে দশকের পর দশক ধরে আমেরিকা যুক্ত রয়েছে ভিয়েতনামের এই জটিলতার মধ্যে। অর্থাৎ কিনা ভিয়েনামের সাথে আমেরিকান সৈন্যবাহিনীর এই সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। এই জটিলতা চলে আসছে আমেরিকান পূর্বকালিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের সময় থেকেই। এরপরেই এলসবার্গ সেই ক্লাইফায়েড তথ্যের নকল করে তা ফাঁস করে দেন 'দ্য নিউইয়র্ক টাইমস' কাগজে, নেইল সিহান নামক এক সাংবাদিকের মাধ্যমে। এদিকে আমেরিকান ডিফেন্সের গোপন তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ হওয়ার আশঙ্কায় ম্যাকনামারা সাহায্যের আর্জি জানায় ক্যাথারিন গ্রাহামের (মেরিল স্ট্রিপ) কাছে, যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর তার একমাত্র সংবাদপত্র 'দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট'-এ প্রকাশকের দায়িত্ব সামলাতে ব্যাস্ত। ম্যাকনামারা তার বান্ধবী গ্রাহামকে জানায় যে 'দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস' ভিয়েতনাম আর সাউথ-ইস্ট এশিয়ার উপর বেশ কয়েক দশক ধরে চলে আসা প্রতারণামূলক বেশ কিছু গোপন তথ্য প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে। যদিও 'দ্য নিউইয়র্ক টাইমস'এর প্রকাশনার কাজ ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের নির্দেশে স্থগিত আছে। এরপর গ্রাহামের মাধ্যমে এই খবর এসে পৌঁছায় 'দ্য পস্ট'-এর চীফ এডিটর বেন ব্র্যাডলি (টম হ্যাংক) কাছে এবং তার থেকে নির্দিষ্ট কিছু কর্মচারীর কাছে। এরপরেই বেন ব্র্যাডলি সিদ্ধান্ত নেয় যে 'দ্য টাইমস' যে সত্যিটা প্রকাশ করতে পারেনি, রাষ্ট্রের স্বার্থে আর গণতন্ত্রের স্বার্থে সেই ক্লাসিফায়েড তথ্য প্রকাশ করবে 'দ্য পোস্ট'। এরপর পোস্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর বেন ব্যাগডিকিয়ান (বব ওডেনকির্ক) অনেক সূত্র ধরে খুঁজে বের করেন এলসবার্গকে, কারণ 'দ্য টাইমস'এর হাতে তথ্য তুলে দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন এলসবার্গ। শেষঅব্দি তিনিও 'দ্য পোস্ট'এর হাতে সেই তথ্যগুলো তুলে দেন যা বেশ কিছুদিন আগে তুলে দিয়েছিলেন 'দ্য টাইমস'এর হাতে। কিছু এইধরনের সংবাদপ্রকাশে বাধা দিতে শুরু করে 'দ্য পোস্ট'-এর অ্যাটর্নি জেনারেল। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ক্রিমিনাল চার্জ আনতে পারে 'দ্য পোস্ট'-এর উপর, এমনকি সংবাদপত্র বন্ধও হয়ে যেতে পারে- এই বলেও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অকুতোভয় ব্র্যাডলি, গ্রাহাম আর 'দ্য পোস্ট'এর চেয়ারম্যান ফ্রিটজ বিবি (ট্র্যাসি লেটস)এর সহমতে প্রকাশ পায় আমেরিকান স্বরাষ্ট্রদপ্তরের চক্রন্তের খবর। এরপর রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের কাঠগড়ায় তোলা হয় 'দ্য টাইমস' আর 'দ্য পোস্ট'কে। কিন্তু বিচার চলাকালীন আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের সব সংবাদপত্র 'দ্য টাইমস' আর 'দ্য পোস্ট'-এর পক্ষে তাদের সংবাদ প্রকাশ করতে শুরু করে। শুধু তাই নয় এলসবার্গের মাধ্যমে ক্লাসিফায়েড তথ্যের বেশ অংশ তারাও প্রকাশ করতে শুরু করে। অবশেষে ১৯৭১এর ৩০শে জুন সুপ্রিম কোর্ট 'দ্য পোস্ট' আর 'দ্য টাইমস'-এর রায় দেয় স্বাধীনভাবে সংবাদপত্র প্রকাশ করার পক্ষে।
পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বলতে গেলে স্পিলবার্গের ('লিংকন', 'ব্রিজ অফ স্পাইস') রাজনৈতিক চলচ্চিত্রগুলো যেভাবে তৈরি করে থাকেন, তার প্রতি পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে এক অদ্ভুত নাটকীয়তা, যা কখনই মেকি বা সিনেমার স্বার্থেই তৈরি বলে মনে হয়না। গল্প বুননের ক্ষেত্রে লিজ হ্যানা আর জোস সিঙ্গার অসাধারণ। শুধু তৎকালীন আমেরিকার আরও কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় তুলে ধরলে সময়টাকে আরো ভালো করে চেনা যেত। যদিও সিনেমার গল্প শেষ হয় নিক্সনের অন্যতম কেলেংকারি 'ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল' দিয়ে, সেটি বেশ প্রাসঙ্গিক লেগেছে। অভিনয়ের দিক থেকে বলতে গেলে যে অসাধারণ দুজন অভিনেতা অভিনেত্রী রয়েছেন, মেরিল স্ট্রিপ আর টম হ্যাংক; তাদের নিয়ে নতুন করে কিছু বলা মানে ধৃষ্টতা। কয়েকটি দৃশ্যে মেরিল আর টমের অসাধারণ কিছু কেমিস্ট্রি রয়েছে, যেমন ক্লাসিফায়েড তথ্য প্রকাশের আগের রাতের দৃশ্য যেখানে গ্রাহাম আর ব্র্যাডলি সহ রয়েছে ম্যাকনামারা এবং সরকারি বেশ কিছু উচ্চপদস্থ কর্তা। গ্রাহাম যেখানে দ্বন্দের মুখে পড়ে যাচ্ছে যে জনগণের স্বার্থ নাকি 'দ্য পোস্ট'এর ভবিষ্যৎ। একদিনে চীফ এডিটর ব্র্যাডলির সত্য প্রকাশের জেদ, অন্যদিকে ম্যাকনামারার মতো লোকের থেকে সরকারি চাপ। অবশেষে সুদূরপ্রসারী সুরক্ষিত ভবিষ্যতের থেকে নৈতিক জয় ঘটে যখন সরকারি চাপ উপেক্ষা করে গ্রাহাম শুধু একটাই কথা বলে 'লেটস ডু ইট'। আর এ শুধু নৈতিক জয় নয়, পুরুষতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মধ্যে থেকে একজন নারীর জয়। আরেকটি দৃশ্য যেখানে গ্রাহাম গোটা অফিসের সকল কর্মচারীদের দিকে তাকিয়ে ভাবনায় পড়ে যান যে যদি এই সংবাদ প্রকাশ পায়, তখন এদের ভবিষ্যৎ কি; সেই দৃশ্যটি অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মেরিল। এছাড়া পার্শ্ব চরিত্র সারা পলসন, ম্যাথু রেস, ক্যারি কুন, জেসি প্লিমোন যথাযথ তাদের ভূমিকা ফুটিয়ে তুলেছেন। ম্যাথু রেসকে আরো একটু সময় দিলে ভালো লাগত। সিনেমায় সঙ্গীতের ব্যাবহার শ্রুতিমধুর। এডিটিংও যথাযথ। যারা একটু অন্যরকম তথ্যমূলক আর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের চলচ্চিত্র পছন্দ করেন, তাদের জন্য 'দ্য পোস্ট' অবশ্যই একটি দুর্দান্ত সিনেমা। আপশোষ তখনই হয় যখন এই ধরণের বিষয়বস্তু নিয়ে আমাদের দেশে চলচ্চিত্রের এখনও অভাব। একটা সংবাদমাধ্যম যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, আবার সেই সংবাদমাধ্যমই যে কতখানি রাষ্ট্রের পক্ষে, জনগণের পক্ষে হিতকর হতে পারে; তা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে হয়েছে সিনেমার শেষে সাংবাদিক মেগ গ্রিনফিল্ডের (ক্যারি কুন) একটা কথার মাধ্যমে, যে কথাটা আসলে সুপ্রিম কোর্টের রায় হিসেবে বলা হয়েছিল 'দ্য পোস্ট'কে উদ্দেশ্য করে, "The Press was to serve the govorned, not the govorners"।
~ঋদ্ধিমান বিশ্বাস

Comments
Post a Comment