Skip to main content

অজানার খোঁজে স্পিলবার্গের 'টিনটিন'-১


২০১০এ 'আনন্দমেলা'য় যখন প্রথমবার জানতে পেরেছিলাম যে এবার বড়পর্দায় আগমন ঘটছে বেঁটে-খাটো, অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ছেলেটার, তখন একজন 'টিনটিন ফ্যান' হিসেবে ভীষণ আনন্দ হয়েছিল। এতকাল 'টিনটিন' শুধু বইয়ের পাতায় আর কার্টুনের পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল। আমার জন্মের আগে ফ্রেঞ্চ-বেলজিয়ান সিনে ইন্ডাস্ট্রি কয়েকটা 'টিনটিন' ফিল্ম তৈরি করেছিল বটে, কিন্তু সেগুলো দর্শকদের মনে একেবারেই কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি। তবে ২০১১তে বড়পর্দায় আরও একবার যখন 'টিনটিন' এল স্পিলবার্গের হাত ধরে, তখন কিন্তু দর্শক তাকে সমাদরে গ্রহণ করে নিয়েছিল আর তারপর থেকে টিনটিন ফ্যানডম অপেক্ষাও করে রয়েছে যে কবে 'টিনটিন'র দ্বিতীয় পর্ব আসবে। 'বোম্বেটে জাহাজ', 'লাল বোম্বেটের গুপ্তধন' আর 'কাঁকড়া রহস্য' (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর দেওয়া বাংলা নামগুলোই ব্যাবহার করলাম, কারণ সেগুলোই আমাদের কাছে বেশি প্রিয়) অবলম্বনে পরিচালক স্পিলবার্গ মশাই বেশ ভালোই বুনন করেছিলেন 'দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ টিনটিন- দ্য সিক্রেট অফ দ্য ইউনিকর্ন'র গল্পটাকে। তবে তথাকথিত সিনেমার রিভিউ করার জন্য আমার এই লেখা নয়। সিনেমাটা বেরোনোর পর কম করে কয়েকশোবার দেখা হয়ে গিয়েছিল একজন 'টিনটিন ফ্যান' হিসেবে। কিন্তু পরে যখন প্লে-পস করে সিনেমার খুঁটিনাটি অংশগুলো খেয়াল করেছিলাম, তখন দেখলাম সিনেমা জুড়ে অনেক অজানা জিনিস, অনেক ট্রিবিউট ছড়ানো রয়েছে নানান দৃশ্যে। শুধু তাই নয়; সিনেমাটা সম্পর্কে পেয়েছিলাম নানান রকম বিশ্লেষণ আর অজানা তথ্য। কিন্তু তার সঙ্গেও রয়েছে কিছু লুপহোলস; যদিও শতকরা হিসেবে তা খুবই খুবই কম। হয়তো একটা কিংবা দুটো। কিন্তু আদ্যোপান্ত 'টিনটিন'এর সিনেমা হিসেবে এটা গোল্ডমাইন। প্রথমেই এই সিনেমার যে জিনিসটা সবথেকে চোখ টানে, সেটা হল এই সিনেমার প্রযুক্তিগত ব্যাপারগুলো। 
স্পিলবার্গের 'টিনটিন' যে পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে, সিনে-প্রযুক্তির ভাষায় তাকে বলা হয় Motion Capture। এই প্রযুক্তিকে ভিত্তি করে প্রথম যে সিনেমাটি হলিউডে তৈরি হয়েছিল, সেটি হল 'দ্য পোলার এক্সপ্রেস'। এরপর ক্যামেরনের 'অবতার', কিংবা 'এপস' সিরিজের সিনেমাগুলি সবেতে এই মোশন ক্যাপচারের জাদু দেখা গেছে। এবার অনেকে বলতেই পারেন যে কমিকসকে অবলম্বন করে হলিউডে ভুরি ভুরি সিনেমা তৈরি হয়েছে যার সবটাই প্রায় লাইভ অ্যাকশান ফিল্ম। এই তালিকায় তো মার্ভেল আর ডিসি তো সবথেকে এগিয়ে। তাহলে 'টিনটিন'এর ক্ষেত্রে মোশন ক্যাপচার কেন! আসলে স্পিলবার্গের আগে যে কটা 'টিনটিন' তৈরি হয়েছিল, তার সবকটিই ছিল লাইভ অ্যাকশান, নাহলে অ্যানিমেশন- যা বাণিজ্যিক ভাবে হোক কিংবা জনপ্রিয়তার দিক থেকে হোক, চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ ছিল। তাও অ্যানিমেশনগুলো কিছুটা দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছিল। কিন্তু খোদ 'টিনটিন'এর স্রষ্টা অ্যার্জেরই খুবই অপছন্দ হয়েছিল অ্যানিমেশন সিরিজগুলো। অথচ 'টিনটিন- দ্য কমপ্লিট কমপ্যানিয়ন' বইয়ের লেখক মাইকেল ফার লিখেছিলেন যে অ্যার্জে মনে করতেন সফলভাবে যদি কেউ 'টিনটিন'কে নিয়ে সিনেমা বানাতে পারে, সেটা একমাত্র স্টিভেন স্পিলবার্গ। ব্যাক্তিগতভাবে অ্যার্জে খুবই ভক্ত ছিলেন স্পিলবার্গের সিনেমার। এর মধ্যেই ১৯৮১ সালে মুক্তি পায় 'ইন্ডিয়ানা জোন্স' সিরিজের প্রথম সিনেমা 'রেইডারস অফ দ্য লস্ট আর্ক'। মূলত এই সিনেমার সংক্রান্ত এক সমালোচনা পড়তে গিয়েই স্পিলবার্গ প্রথম জানতে পারেন 'টিনটিন'এর কথা। জানার পরেই তার নিজের সেক্রেটারিকে দিয়ে কিনে ফেলেন 'টিনটিন'এর গোটা কমিকসের সিরিজটি। কমিকসগুলো সবকটা পড়ার পরেই স্পিলবার্গ অসম্ভব ফ্যান হয়ে যান 'টিনটিন'এর। এরপর ১৯৮৩তে যখন 'ইন্ডিয়ানা জোন্স'এর দ্বিতীয় সিনেমা 'দ্য টেম্পলস অফ ডুম'এর কাজ চলছে, সেইসময়ই স্পিলবার্গ অ্যার্জের সাথে দেখা করতে চান 'টিনটিন'কে নিয়ে সিনেমা করার ব্যাপারে। দুর্ভাগ্যবশত, অ্যার্জে সেই সপ্তাহেই মারা যান। কিন্তু নিরাশ হতে হয়নি স্পিলবার্গকে। অ্যার্জের শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী শেষঅব্দি অ্যার্জের স্ত্রীর হাত ধরে 'টিনটিন'এর কপিরাইট চলে আসে স্পিলবার্গের হাতে। সেই থেকে শুরু হল 'টিনটিন' তৈরির পরিকল্পনা এবং 'ইউনিভার্সাল' পরিবেশকের হাত ধরে ১৯৮৪তে 'টিনটিন'কে নিয়ে সিনেমা তৈরির কথা চূড়ান্ত করে ফেলেন স্পিলবার্গ। প্রথমে স্পিলবার্গ ঠিক করেছিলেন 'কঙ্গোয় টিনটিন'এর উপর ভিত্তি করে চিত্রনাট্য লিখবেন এবং সেটি লেখাও হয়েছিল 'ই টি'র চিত্রনাট্যকার মেলিসা ম্যাথিসনের কলমে। কিন্তু শেষ অব্দি সেই চিত্রনাট্য পছন্দ না হওয়ায় স্পিলবার্গ 'ইন্ডিয়ানা জোন্স'এর তৃতীয় ছবি 'দ্য লাস্ট ক্রুসেডের' কাজে হাত দেন। স্পিলবার্গ মূলত 'ইন্ডিয়ানা জোন্স'এর দ্বিতীয়  ছবি থেকেই ডঃ জোন্সের চরিত্রটিকে আস্তে আস্তে টিনটিনের মতো করেই গড়তে শুরু করেছিলেন। শেষে যখন 'দ্য লাস্ট ক্রুসেড' মুক্তি পায়, তখন সমালোচকদের মতে ডঃ জোন্সের আদব-কায়দা অধিকাংশেই হয়ে উঠেছিল তরুণ 'টিনটিন'এর মতো। স্পিলবার্গ পরবর্তীকালে 'টিনটিন' তৈরির সময় বিভিন্ন ইন্টারভিউতে বলেছিলেন যে টিনটিন হল আসলে ছোটদের ইন্ডিয়ানা জোন্স। 'দ্য লাস্ট ক্রুসেড' আর 'ইন্ডিয়ানা জোন্স'এর চতুর্থ সিনেমা 'দ্য কিংডম অফ দ্য ক্রিস্টাল স্কাল'এ তিনি জোন্সকে হুবহু 'টিনটিন'এর ভঙ্গিতেই গড়েছেন। যাইহোক, 'দ্য লাস্ট ক্রুসেড'এর মুক্তির পরের সময়ের কথায় আসি। ততদিনে অবশ্য স্পিলবার্গ 'টিনটিন' না তৈরি করতে পারার জন্য তার কপিরাইটের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। যার ফলে 'ইউনিভার্সাল'এর পরে ওয়ার্নার ব্রাদারস কিনে ফেলে 'টিনটিন'এর কপিরাইট। কিন্তু শেষ অব্দি তারা আর বানিয়ে উঠতে পারেনি। এরপর ২০০১এ স্পিলবার্গ আবারও উঠে পড়ে লাগেন 'টিনটিন'কে নিয়ে সিনেমা বানানোর জন্য। এবার ২০০২তে তার নিজের স্টুডিয়ো 'ড্রিমওয়ার্কস' আবারও রাইটস কেনে 'টিনটিন'এর। এবারে সম্পূর্ণ ট্রিলজি তৈরি পরিকল্পনা করলেন স্পিলবার্গ। 'বোম্বেটে জাহাজ-লাল বোম্বেটের গুপ্তধন' আর 'মমির অভিশাপ-সূর্যদেবের বন্দী' আর 'নীলকমল-তিব্বতে টিনটিন'; এই ছিল তার সম্পূর্ণ ট্রিলজির গল্প। শেষের গল্প দুটো একই না হলেও 'চ্যাং চো চেন' নামে চরিত্রের জন্য গল্পদুটিকে বেছেছিলেন স্পিলবার্গ। প্রথমে অবশ্য তিনি ভেবেছিলেন যে তিনি শুধুই প্রযোজনাই করবেন, আর ট্রিলজিগুলো তৈরি হবে লাইভ অ্যাকশান নির্ভর। ঠিক এই সময়তেই তার সাথে দেখা হয় পিটার জ্যাকসানের।

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...