Skip to main content

লেখায় ছড়ায় 'ক্রিড়া হবে'।

(একটি কাল্পনিক সামাজিক চিত্র। বাস্তবের সাথে মিল পেলেও চুপটি করে মজা নিন)

'ঘরে ঘরে দিচ্ছে ডাক, রবির হাতেই বাংলা থাক'! চমকে গেলেন স্লোগানটা পড়ে? ধরুন একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে, দাঁতকপাটি খুব ফেনা করে মেজে, এককাপ গরম চা নিয়ে বসলেন 'বাংলা'র জনপ্রিয় সংবাদপত্রখানি নিয়ে। কিন্তু কাগজের প্রথম পাতায় চোখ বুলাতেই চমকে গেলেন। দৈনন্দিন রাজনৈতিক তরজা আর নেতা-নেত্রীর মুখ আর নেই তাতে! তার বদলে রয়েছে বাংলার হেভিওয়েট কবিদের তরজার খবর আর তাদের ছবি। ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই বাড়ির সদর দরজায় কলিং বেল বেজে উঠল। দরজা খুলে দেখলেন চার পাঁচটি অল্পবয়সী তরুণ, পরনে খাদির পাঞ্জাবি আর ঢোলা পায়জামা। মুখে উস্কোখুস্কো দাড়ি, কাধেতে ঝোলা ব্যাগ আর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামনের দিকে থাকা নেতা গোছের তরুণটি গম্ভীর গলায় বলে উঠল- 'নমস্কার কাকু, এবার ভোটটা "পোস্টম্যান" চিহ্নে দেবেন'। সঙ্গে সঙ্গে বাকি তরুণরা স্লোগান দিয়ে উঠল, 'তোমার মুক্তি, আমার মুক্তি, এবার শক্তি এবার শক্তি'। ও আচ্ছা, 'হেমন্তের পোস্টম্যান'! 

আরে মশাই, এখনও বুঝতে পারলেন না? আরে এক রাতে বাংলার রাজনীতিতে আর রাজদন্ডই নেই। তার নীতি বদলে এবারের নির্বাচন লড়ছেন বাংলার কবিরা। কি সাংঘাতিক! কোথায় গেলেন আমাদের দিদি, কোথায় আমাদের সেই 'কবিগুরু'র মতো দেখতে মানুষটা! তার বদলে জোড়াসাঁকো থেকে সকাল সকাল খোদ কবিগুরুই হুডখোলা জীপের পেছনে একটা আরাম কেদারায় বসে দিব্যি হাত নেড়ে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। কবি দাঁড়িয়েছেন উত্তর কোলকাতায়, "গীতাঞ্জলি' দলের পক্ষ থেকে। দিকে দিকে চিহ্ন 'নোবেল', আর নির্বাচনী স্লোগান লিখেছেন কবি নিজেই- "তুমিও রবে, আমিও রবে, সখা এবার ক্রিড়া হবে, ক্রিড়া হবে"। রবির উল্টোদিকে হেভিওয়েট প্রতিযোগী প্রার্থী রয়েছেন নজরুল ইসলাম, বর্ধমান থেকে। দিব্যি গঙ্গার বক্ষ দিয়ে 'ভুলিতেছে মাঝি'দের নিয়ে দোদুল্যমান তরীতে 'এক বৃন্তে দুটি কুসুম' চিহ্ন নিয়ে পুরোদমে প্রচার চালাচ্ছেন। নজরুল কিন্তু প্রচারে কোনোরকম খামতি রাখছেন না। আলিপুরের কারার লৌহকপাট থেকে কালীঘাটে 'কালো মেয়ের পায়ের তলা'য় সর্বত্র, দিকে দিকে তার চিহ্ন ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বাংলার নব্য কবিদের নিয়ে 'ইন্ডিয়ান পোয়েট লিবারেশন' (আইপিএল) নামে আরেকটা নতুন দল এই নির্বাচনে নমিনেশন পেয়েছে। এদেরকে কেউ সেভাবে খুব একটা চেনে না। এদের বেশিরভাগই তরুণ হলেও বেশ কয়েকজন এই কদিনের মধ্যে বেশ নাম করে ফেলেছে। যেমন শক্তি, সুনীল, বিনয়, প্রেমেন্দ্র ইত্যাদি ইত্যাদি। এরা আবার সুকান্তের দল 'একুশ'এর সাথে নাকি যুক্তফ্রন্ট গড়বে বলে শোনা যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহে কোলকাতার কফি হাউসে এদের বিরাট মিটিংএর মাধ্যমেই নাকি এই ফ্রন্ট তৈরি হবে। তখন এদের কি বলা হবে?  ২১এর আইপিএল? 

কবিগুরু কিন্তু এদের তুলনায় নির্বাচনী প্রচারে অনেকটাই এগিয়ে। যতই হোক, শাসক দল বলে কথা। কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি থেকে বাষ্পীয় শকট- সবতেই এখন "আমার সোনার বাংলা, আমি গড়তে ভালোবাসি" পোস্টার। 'গীতাঞ্জলি' দলেও হেবিওয়েট কবিদের ভীড়। বিহারীলাল দত্ত থেকে জীবনানন্দ দাস। সমস্যায় পড়েছেন ছন্দের কবি সত্যেন্দ্রনাথ। এতদিন 'গীতাঞ্জলি'তে কাজ করার পর গতকাল জোড়াসাঁকোর সাহিত্যসভায় ছন্দের বিল পাশ করতে পারেননি তিনি। উলটে তিনি ক্ষোভ উগড়ে দেন স্পিকার জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সামনেই, 'দলে থেকে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে'। এখন তিনি দলত্যাগ করবেন নাকি থেকে যাবেন- সেটাই দেখার এখন। অন্যদিকে গতকাল প্রেস কনফারেন্সে 'নিখিল ভারতীয় লেখক পরিষদ'এর অনেকে "দলে থেকে কাজ করতে পারছি না" আর "কবিতার জন্য কিছু করতে চাই" এই বলে একসাথে দাবী জানিয়েছেন। এদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, দীনবন্ধু মিত্র ইতিমধ্যে 'গীতাঞ্জলি' দলে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের বামপন্থী মনোভাবের জন্য তাকে 'গীতাঞ্জলি' দল বয়কট করার চিন্তা করছে। সব মিলিয়ে গরমা গরম পরিবেশ এবারের বাংলার সাহিত্যসভা নির্বাচন!

~ঋদ্ধিমান।

Comments

Post a Comment

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...