Skip to main content

বুদ্ধিজীবি ও রাজনীতি:- বুদ্ধিজীবি হতে গেলে কি রাজনৈতিক দলের সদস্য হতেই হবে?

 


ইদানিং একটা সমস্যা দেখা যাচ্ছে যে বুদ্ধিজীবি মানেই নাকি বাম-সমর্থক। এটা প্রায় প্রত্যেকেই বলছেন। এতে দুটো দিক আছে। এক, যারা বাম সমর্থক নন; তারা এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের হিংসার শিকারের দিকে দেগে দিচ্ছেন। আর অন্য দিকটা হল, যারা বাম সমর্থক; তারা দু হাত তুলে নৃত্য করছেন যে “ওই যে, ও আমার দলকে সমর্থন জানাচ্ছে’। এখানে দুটো দিকেরই চরম অশিক্ষাটাই প্রকাশ পাচ্ছে। পৃথিবীতে এটা কেউ বলেনি যে বুদ্ধিজীবি হতে গেলে বাম-সমর্থক হতেই হবে। এমন কোনো বুদ্ধিজীবি থাকতেই পারেন যিনি হয়তো ডান-পন্থী। আপনি একটু পেছনের দিকে তাকান। রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্র যদি কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে রাখি; সাহিত্যরসটা কিছু সময়ের জন্য বর্জন করি, তাহলে আপনি ‘গোরা’ পড়ুন, ‘ঘরে বাইরে’ পড়ুন, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ শুনুন- স্পষ্ট বুদ্ধিজীবি ভাবধারা রয়েছে ওনার রচনায়। আর সেটা তীব্রভাবে ডানপন্থী। কংগ্রেসকে চিরকাল সমর্থন করে এসেছেন। এই তালিকায় স্বয়ং দ্বীজেন্দ্রলাল রায়ও রয়েছেন। হ্যাঁ, বিশ্বের তাবড় তাবড় বড় বুদ্ধিজীবিদের দিকে তাকালে হয়তো দেখা যাবে, তারা প্রায় সকলেই বামপন্থী। এখন দেখতে হবে সেই বুদ্ধিজীবিরা তাদের বুদ্ধিটা বামপন্থী দলের স্বার্থে লাগাচ্ছেন, নাকি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে, নিজেরা জড়মুক্ত হয়ে সমাজের জন্য সত্যিই ভাবছেন বা কিছু করার চেষ্টায় আছেন। কিছুদিন আগে আমার একজন বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল এই প্রসঙ্গেই যে তথাকথিত বুদ্ধিজীবি হতে গেলে বামপন্থী দলে সামীল হতে হবে কিনা বা কোনো রাজনৈতিক পতাকার তলায় আসতে হবে কিনা। সে উত্তরে অমর্ত্য সেনের একটি কথা মনে পড়ে গেল যেটা আমি এক বিশেষ পত্রিকায় পড়েছিলাম। সেটা হল- ‘মার্কস পড়লেই যে তাকে মার্কসবাদী হতেই হবে, সেরকমটা কোনো মানেই নেই’। সুতরাং বুদ্ধিজীবি হলেই, বাম-মতাদর্শে নিজেকে তৈরি করলেই যে তাকে রাজনীতির মঞ্চে চলে আসতে হবে, এটা খুবই ভুল ধারণা। এরকম মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। একটা চূড়ান্তভাবে বাম-মতাদর্শে দর্শিত লেখা কিংবা গান কিংবা নাটক কিংবা সিনেমা কেউ এমন একজন লিখতেই পারেন বা বানাতেই পারেন যিনি হয়তো বামপন্থী দলটাকেই সমর্থন করেন না। তিনি বলতেই পারেন যে লেনিন যা করেছে ভুল করেছে; মানিই না তার দলকে। কিন্তু তাই বলে তার বাম-মনস্ক আদর্শ মিথ্যে হয়ে যায় না। দল কলুষিত হতে পারে, নেতা-নেত্রী কলুষিত হতে পারে; কিন্তু আদর্শ নয়। কিছুদিন আগে বাংলার কিছু কলাকুশলীরা মিলে একটি ভিডিয়ো বানিয়েছেন, একটি গান রচনা করেছেন; যেটাকে বহু লোকে বামপন্থী ভাবধারার সঙ্গে মিল পেয়ে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। সমস্যাটা সেখানে নয়। সমস্যাটা হল, সেই ভিডিয়ো দেখে কিছু অশিক্ষিত লোক প্রশ্ন তুলছেন যে বামেরা কি এটা প্রকাশ করে ৭%-এর বেশি উৎরাতে পারবে। এ প্রশ্ন আমার কাছেও এসেছিল। মুস্কিলটা হল এখন যে হারে শিল্পীরা রেশনে লাইন দেওয়ার মতো রাজনৈতিক দলে নাম লেখানোর জন্য লাইন দিচ্ছেন, তাতে বুদ্ধিজীবিদের ভাবধারার সঙ্গে রাজনীতির মঞ্চটাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কাজেই লোকে এটা এখন ধরেই নিচ্ছে যে বুদ্ধিজীবি মানেই ও রাজনীতি করে। সেটা চিন্তা করলে ঋত্বিক ঘটকের সিনেমাগুলো রিলের মধ্যেই রয়ে যেত, সলিল চৌধুরীর গান আর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা থেকে যেত তাদের লেখার খাতাতেই। এই রাজনীতির সাথে বুদ্ধিজীবিদের দেগে দিয়ে যেটা হচ্ছে যে বুদ্ধিজীবিরা সত্যিকারের সম্মান পাচ্ছেন না; যার ফলে তারা সমাজের একটা সূচী চিন্তাভাবনার কাজেও পিছিয়ে যাচ্ছেন আজকে। সর্বোপরি একটা সংজ্ঞা ভালো করে বুঝতে হবে মানুষকে যে আদর্শ বুদ্ধিজীবি মানেই রাজনীতিবিদ নন। আদর্শ বুদ্ধিজীবি তারাই, যারা পড়াশুনা করে, যুক্তি দিয়ে সবটা বিচার করে, সমাজের মঙ্গলময় কল্যাণময় দিকের কথা ভেবে, রাজনৈতিক দলের উর্ধে গিয়ে তাদের বক্তব্য প্রকাশ করবেন সকলের সামনে, সেটা শিল্পের মাধ্যমে হোক কি শিক্ষার মাধ্যমে কি সাহিত্যের মাধ্যমে।


~ঋদ্ধিমান

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...