Skip to main content

বাঙালীর ফুটবলের সর্বাধিকারী (প্রথম পর্ব)


 

১৮৭৭র সেপ্টেম্বরের সকাল। সকালবেলা পুত্রকে নিয়ে ডঃ সূর্যকুমার সর্বাধিকারীর স্ত্রী হেমলতা দেবী গঙ্গাস্নানে বেরিয়েছেন ঘোড়ার গাড়িতে। গঙ্গাস্নান থেকে ফেরার পথে হেমলতা দেবীর গাড়িখানা আসছিল ক্যালকাটা এফসি-র ট্রেনিং গ্রাউন্ডের উত্তর দিক থেকে। গাড়ি থেকে যেতে যেতে হেমলতা দেবীর পুত্র দেখলেন যে কয়েকজন ব্রিটিশ সৈন্য একখানা গোল আকৃতির বল নিয়ে সেই গ্রাউন্ডে কিছু একটা খেলছে। ছোটো ছেলেটার কৌতূহলী দৃষ্টি শুধু তখন সেই বলখানার দিকেই আবদ্ধ। হঠাৎই সেনাদের পায়ের কিকে বলখানা সোজা ছুটে এল তাদের গাড়ির দিকে। ঘোড়ার গাড়িটা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ছোটো ছেলেটা এক নিমেষে গাড়ির দরজা খুলে রাস্তায় নেমে এল সরোজমিনে সেই বলটা ভালো করে লক্ষ্য করতে। অন্যদিকে গোরা সৈন্যরা ততক্ষনে মাঠের ওধার থেকে হেঁকে বলছে, “কিক ইট টু আস, বয়”। ছেলেটা গাড়ি থেকে আসতে আসতে গোরা সৈন্যদের যেভাবে বলটাকে নিয়ে কিক করতে দেখেছিল, ঠিক সেভাবেই মোক্ষম একটা কিক দিয়ে পাঠিয়ে দিল গোরা সৈন্যদের দিকেই। ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে ১৮৭৭র সেই সকালেই ক্যালকাটা এফসি-র উত্তরের রাস্তা থেকেই প্রথম কোনো ভারতীয়, ওরফে একজন বাঙালী ফুটবলে কিক মারলেন। তখন কি আর গোরা সৈন্যরা জানত যে এই ছেলেটাই একদিন ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে, যাকে লোকে চিনবে নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী নামে।

নগেন্দ্রপ্রসাদের আগে ১৯শতকের প্রথম দিক থেকেই ভারতে ফুটবল খেলাটা মোটামুটি শুরু হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য তখন খেলাটা শুধু ছিল ইউরোপিয়ানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নির্মল নাথের ‘ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস’ থেকে জানা যায় যে ভারতে প্রথম ফুটবল খেলার সাক্ষ্য পাওয়া যায় একমাত্র বম্বেতে, ১৮০২এ। মাত্র ৩০ মিনিটের এই ম্যাচে ‘মিলিটারি’ আর ‘আইল্যান্ড’ নামে দুটি দলের মধ্যে এই খেলাটা হয়েছিল। এই সূত্র ধরেই কোলকাতায় ফুটবল খেলা চালু হল ১৮৩৮এ ‘ইটোনিয়ানস’ ভার্সেস ‘রেস্ট অফ ক্যালকাটা’।এরপর ১৮৫৪র ১৩ই এপ্রিলে ‘ক্যালকাটা ক্লাব অফ সিভিলিয়ান’ ভার্সেস ‘জেন্টেলমেন অফ ব্যারাকপুর”। ১৮৭০র থেকেই কোলকাতায় ফুটবল ম্যাচও বেশ ঘন ঘন হতে শুরু করল। ব্রিটিশ সৈন্য, ব্যাবসায়ী, নাবিক- এরা সকলেই খেলতে লাগলেন ফুটবল। আর এদের এই খেলার আগ্রহের কারণেই ১৮৭৮এ তৈরি হল ট্রেডারস ক্লাব, অর্থাৎ আজকের ডালহৌসি ক্লাব। আর তার আগে থেকে তো ক্যালকাটা এফসি ছিলই। তবে এই এতকাল অব্দি কিন্তু ফুটবল কোনোভাবেই ভারতীয়দের জীবনে প্রবেশ করেনি।

যাই হোক, সেই সকালে ফুটবলে কিক মারার গল্পটা রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠল নগেন্দ্রপ্রসাদের বন্ধু মহলে। নগেন্দ্রপ্রসাদের আদি বাড়ি হুগলীর রাধানগরে হলেও জন্মেছিলেন কোলকাতায় আর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল হেয়ার স্কুলে। তো গোরাদের সেই ফুটবলে কিক মারার পর নগেন্দ্রপ্রসাদ ভাবলেন তার এই অতি উৎসাহী বন্ধুদের সঙ্গে করে খেলাধুলো নিয়ে কিছু একটা করতে হবে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। চাঁদা তুলে ৩ টাকা ৭০ পয়সা দিয়ে কোলকাতা বৌবাজারের মেসার্স ম্যান্টন এন্ড কোং, যারা কিনা সেসময় বিখ্যত ছিল খেলার সামগ্রী তৈরি করাতে, সেখান থেকে কিনে আনলেন ফুটবল। কিন্তু কিভাবে খেলতে হয় বা এই খেলার নিয়মকানুন কি- সেসব কিছুই জানতেন না তারা। নেটিভদের এইরকম উৎসাহ দেখে কৌতূহল বোধ করলেন এক সাহেব। তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রফেসর জি এ স্টাক। হেয়ার স্কুলের পাশে প্রেসিডেন্সীর ব্যালকনি থেকে দেখলেন নগেন্দ্রপ্রসাদ আর তার বন্ধুদের ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা। অবশ্য স্টাক প্রথমে বুঝতে পারেননি তারা ফুটবল খেলার চেষ্টা করছে, নাকি রাগবি! যাই হোক, প্রেসিডেন্সীর আরেক প্রফেসর জি এইচ গিলিগান্ডকে সঙ্গে নিয়ে প্রফেসর স্টাক সত্যিকারের ট্রেনিং দিতে শুরু করলেন নগেন্দ্র ও তার দলকে। খুব দ্রুতই নগেন্দ্র শিখে নিতে শুরু করল ফুটবল। নেতৃত্ব দেওয়াটা হয়তো তার সহজাত ছিল বলেই অচিরেই তার দলের দলপতি হয়ে উঠলেন নগেন্দ্র। তৈরি করলেন ‘বয়েজ ক্লাব’, যা কিনা প্রথম ভারতীয় ফুটবল ক্লাব হিসেবে পরিচিত পায়। ক্রমে প্রেসিডেন্সীর ছাত্ররাও এই বয়েজ ক্লাবের সদস্য হয়ে হেয়ার স্কুলের সাথে ফুটবলে অংশ নিতে শুরু করল। এরপর প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নগেন্দ্র ফুটবল ছাড়াও রাগবি, টেনিস, ক্রিকেট, হকি- এসব খেলার দিকেও সকলকে উৎসাহিত করতে শুরু করলেন। তিনি ও তার বন্ধু বামাচরণ কুন্ডু তৈরি করলেন হাওড়া স্পোর্টিং, যা প্রথমবারের জন্য হাওড়াকে দেশের জন্য খেলার জগতে প্রবেশ ঘটাল। এরপর ১৮৮৪তে নগেন্দ্রপ্রসাদ কোলকাতার ময়দানে তৈরি করলেন ভারতীয়দের জন্য আরেকটি ক্লাব- ওয়েলিংটন ক্লাব, যেখানে সব ধরণের খেলারই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।

(ক্রমশ)

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...