ধীরে ধীরে কয়েক বছরের মধ্যে নগেন্দ্রপ্রসাদের হাত ধরেই গোটা বাঙালিকে এই নেশায় পেয়ে বসল- ফুটবল। এই ফুটবলের নেশা পেয়ে বসল স্বয়ং নরেন্দ্রনাথ দত্তকেও। তখনও তিনি স্বামী বিবেকানন্দ হননি। বাঙালিকে আরো খেলা-পাগল করে তুলতে ১৮৮৭তে নগেন্দ্রপ্রসাদ আবারও তৈরি করলেন আরেকটি ক্লাব- শোভাবাজার ক্লাব। কিন্তু এর মাঝেই একটি অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটল ওয়েলিংটন ক্লাবে। মণি দাস নামে নীচু জাতের এক যুবক ওয়েলিংটন ক্লাবের সদস্য হতে চাইলে সেখানকার সভ্যরা তাকে অস্বীকার করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে নগেন্দ্রপ্রসাদ ক্লাবটিকেই তুলে দেন। ক্রমে নতুন শোভাবাজার ক্লাবই আস্তে আস্তে হয়ে উঠতে থাকে নগেন্দ্রপ্রসাদের মূল ঘাঁটি। প্রায় ৫০০র বেশি সদস্য ছিল এই ক্লাবে তখনকার দিনেই। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন কোচবিহারের রাজা ভূপেন্দ্র নারায়ণ ভূপ বাহাদুর, আর জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন শোভাবাজার রাজবাড়ির জিষনেন্দ্র কৃষ্ণ দেব বাহাদুর ও নগেন্দ্রপ্রসাদ নিজে। সমস্ত জাত, ধর্ম, বর্ণ- এ সবেরই উরধে ছিল এই শোভাবাজার ক্লাব।
ভারতের
ফুটবলের ইতিহাসে নগেন্দ্রপ্রসাদের মতোই সবথেকে বেশি যদি কেউ ভেবে থাকেন, তাহলে তিনি
কোচবিহারের রাজা ভূপেন্দ্র নারায়ণ ভূপ বাহাদুর, যার প্রথমে শোভাবাজার ক্লাব ও পরে মোহনবাহান
ক্লাব তৈরিতে এক বিশেষ ভূমিকা ছিল। মূলত তার পরিকল্পনাতেই একেবারে দেশীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের
প্রচলন হয়, এবং চালু হয় কোচবিহার কাপ। কোচবিহারের রাজার দেখাদেখি এগিয়ে আসেন বর্ধমান,
পাতিয়ালা, মহিষাদল ও সন্তোষ রাজবাড়িও। শুধু শোভাবাজার ক্লাবই নয়; নগেন্দ্রপ্রসাদ খুবই
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন মন্মথনাথ গাঙ্গুলির ন্যাশানাল অ্যাসোসিয়েসন আর দুখিরাম
মজুমদারের আর্য ক্লাবের ক্ষেত্রে, যারা খেলাকে জাতীয়তাবোধের সাথে সংজোজন করে এক অন্য
মাত্রা দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র ক্লাব তৈরিতেই নন, নগেন্দ্রপ্রসাদ নিজেও ছিলেন একজন শোভাবাজার
তথা গোটা দেশের মধ্যে সেরা প্লেয়ার। রাখাল ভট্টাচার্যের ‘কোলকাতার ফুটবল’এই বিবরণ রয়েছে
যে নগেন্দ্রপ্রসাদ কত সংখ্যক গোল করেছিল তার হিসেব নেই। কিন্তু অমন সেন্টার ফরওয়ার্ড
সেসময় খোঁজ পাওয়া ছিল বিরল। তিনিই সর্বপ্রথম প্রমাণ করেছিলেন যে বুট ছাড়াও ভারতীয়রা
বাকিদের তুলনায় অত্যন্ত সুনিপুণভাবেই কিক করতে সক্ষম।
১৮৮৭তে
ব্রিটিশরা প্রথম ভারতীয় টুর্নামেন্ট হিসেবে চালু করল ট্রেডস চ্যালেঞ্জ কাপ, যেখানে
ভারতীয়-ইউরোপীয় সকলেই অংশ নিতে পারবে। নগেন্দ্রপ্রসাদের শোভাবাজার ক্লাবই ছিল প্রথম
ভারতীয় ক্লাব যারা এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করল। বাঙালি তথা ভারতীয়রা সেই প্রথম দেখল
এগারোজন বুট পরা গোরাদের বিরুদ্ধে এগারো জন খালি পায়ের বাঙালি ফুটবলাদের ম্যাচ। ১৮৯২তে
শোভাবাজার ক্লাব শেষ অব্দি ব্রিটিশদের ইস্ট সারে ক্লাবের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। এইরকম
একটা খবর ভারতীয় থেকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম প্রত্যেকে প্রকাশ করেছিল। আর নগেন্দ্রপ্রসাদ
শুধু বাঙালি রাজপরিবারগুলোই থেকেই নয়, সম্মান পেয়েছিলেন খোদ পাটিয়ালার রাজপরিবার থেকেও।
এরপর নগেন্দ্রপ্রসাদ ফুটবলের জন্য আরও বড় কাজে নিজেকে তৈরি করলেন। ইংলিশ এফএ কাপের
ধাচে ভারতেও একটি টুর্নামেন্ট শুরু করতে চাইলেন। সেইমতো ১৮৯২তে ক্যালকাটা এফসি এবং
ডালহৌসি এফসি-দের সঙ্গে করে বসলেন টুর্নামেন্টের ব্লু-প্রিন্ট নিয়ে। এর ফল স্বরূপই
১৮৯৩তে জন্ম হল ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের, যার সর্বোচ্চ সম্মান হল আইএফএ শিল্ড।
এবারেও এগিয়ে এলেন পাটিয়ালা ও কোচবিহারের মহারাজা, আর্মেনিয়ান ক্লাব ও ডালহৌসি ক্লাব।
শিল্ড ট্রফির নকশা করল ওয়াল্টার লকি এন্ড কোম্পানি আর তৈরি করল এলকিংটন এন্ড কোম্পানি।
নগেন্দ্রপ্রসাদের প্ল্যান অনুসারে দুটো অঞ্চলে ভাগ হল এই আইএফএ- একটা ওয়েস্টার্ন জোন,
অন্যটা ইস্টার্ন জোন। ইস্টার্ন জোনের মূল ঘাঁটি ছিল কোলকাতা যার মধ্যে পড়ত চারটি ব্রিটিশ
রেজিমেন্টাল ক্লাব, চারটি ব্রিটিশ সিভিলিয়ান ক্লাব আর শোভাবাজার ক্লাব। ততদিনে মোহনবাগান
আর মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব তৈরি হয়ে গেছে। বাংলা সহ গোটা ভারতই তখন ফুটবলের উন্মাদনায়
মত্ত। ১৯০০ সাল থেকে আইএফএ-র গভর্নিং বডি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে
হয়নি ভারতীয় ফুটবলকে। আর ঠিক এইসময়ই ১৯০২ সালে কোলকাতা হাইকোর্টের অ্যাটর্নি হয়ে ভারতীয়
ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ালেন নগেন্দ্রপ্রসাদ। হঠাৎ ফুটবলের জগৎ ছেড়ে কেন আদালতের পেশাকে
বেছে নিলেন তিনি, তা আজও অজানা। তবে নগেন্দ্রপ্রসাদ ফুটবল ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর টিকে
থাকেনি শোভাবাজার ক্লাবও। কারণ ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহামেডান ক্লাবের দাপটে ইতিহাসের
ধুলোয় ঢাকা পড়ে গেছিল শোভাবাজার ক্লাব।
১৮৭৭
থেকে ১৯০২ অব্দি প্রায় ৭০০-র বেশি ম্যাচ খেলেছিলেন নগেন্দ্রপ্রসাদ। আর শুধু ফুটবল কেন।
ক্রিকেটেও তার মতো প্লেয়ারের ছিল জুড়ি মেলা ভার। কারণ তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় বোলার
যিনি ওভারহেড বোলিং করতেন। ক্রিকেটার মোনা বোস, সুধম্বা বোস ছিলেন তারই ছাত্র। এর পাশাপাশি
বাঙালি ছেলেদের নিয়ে রাগবি দলও তৈরি করেছিলেন নগেন্দ্রপ্রসাদ। খেলা ছাড়াও তিনি দক্ষ
ছিলেন ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষায়। ছিলেন একজন কবি, সাহিত্যরসিক, নাট্যকার, নাট্যসমালোচক,
কীর্তন গানের একজন সফল শিল্পীও। ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন শেক্সপিয়ারের
‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’। তাই মান্না দে-র কন্ঠে আজও যখন পাড়ার কোনো ফুটবল টুর্নামেন্টে
‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’ বেজে ওঠে, কিংবা যুবভারতীতে যখন বাঙালি মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের
জন্য উন্মাদনায় মত্ত হয়ে ওঠে; তখন কি ইতিহাস একবার হলেও স্মরণ করে যে বাঙালিকে এরকম
খেলা পাগল করে তুলেছিলেন, বাঙালিকে ফুটবল খেলা চিনিয়েছিলেন , তিনি আর কেউ নন- শ্রী
নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী!
Comments
Post a Comment