তারিখটা নিয়ে কিছু বলা আগে গল্পটা শুরু করব ১৯৩০এর ১৯শে এপ্রিল নিয়ে। না, ঋতুপর্ণ ঘোষের '১৯শে এপ্রিল' নয়। ব্রিটিশ শাসিত চট্টগ্রামের ১৯শে এপ্রিলের সকাল। ম্যাজিস্ট্রেট উইলকিন্সনের সকাল থেকে মাথায় হাত পড়ে গেছে গতকাল রাতের ঘটনা শুনে। তার মধ্যে তিনি নিজে কিছু জায়গায় সশরীরে পর্যবেক্ষন করে এসেছেন। গত কয়েক ঘন্টায় চট্টগ্রামের দুখানা গুরুত্বপূর্ণ রেললাইন ধুম আর নাঙ্গালকোট উপড়ে ফেলা হয়েছে, সরকারী টেলিফোন ভবন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, চট্টগ্রামের সমস্ত টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের লাইন ছিন্ন। আর সবথেকে ভয়ংকর হল চট্টগ্রামের পুলিশ লাইনের প্রধান অস্ত্রাগার লুঠ হয়েছে। রেলওয়ে অক্সিলারি ফোর্স অস্ত্রাগারও অগ্নিভূত। চট্টগ্রামের মতো এরকম শান্ত একটা জায়গায় কার এত বড় সাহস যে খোদ ব্রিটিশের নাকের ডগা দিয়ে এরকম কাজ করে বেরিয়ে যায়! তবে কাজগুলো যে বাংলার স্বদেশীদের, সেটা বুঝতে বাকি নেই ব্রিটিশ সরকারের। উইলকিন্সন তড়িঘড়ি মিলিটারি শাসন জারি করলেন গোটা চট্টগ্রাম শহরে। চট্টগ্রাম দিয়ে প্রত্যেকটা বেরোনোর পথে বসালেন কড়া পাহারা, রেলস্টেশনগুলোতেও বসল কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- টেলিগ্রাফ ব্যাবস্থা যত দ্রুত সম্ভব সারিয়ে কোলকাতা ফোর্ট উইলিয়ামে একটা তার পাঠানো হল, "চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন। দ্রুত সাহায্য দরকার। স্বদেশীরা সম্ভবত চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে লুকিয়ে আছে"।
সেই ১৯৩০এর ১৮ই এপ্রিলের রাতটা মনে থাকবে প্রত্যেক ইতিহাসের পাতায়। রাত ৯ঃ৫০ মিনিটে ততক্ষণে চট্টগ্রামের ধুম আর নাঙ্গালকোট লাইন উপড়ে ফেলেছে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির বিপ্লবীরা। রেললাইন উপড়ে ফেলার ক্যাপ্টেন লালমোহন সেন। ঠিক তার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ৯ঃ৫৫তে ক্যাপ্টেন অম্বিকা চক্রবর্তীর নির্দেশে বিপ্লবীরা শেভ্রালো গাড়িতে আর সাইকেলে এসে উপস্থিত হল চট্টগ্রাম সরকারি টেলিফোন ভবনের সামনে। খুব দ্রুত কাজটা সারতে হবে। সব একেবারে সময়মাফিক হওয়া চাই। টেলিফোন ভবন বন্ধ হয়ে গেছে রাত ৮টা তেই। কিন্তু অফিসের কিছু কাজের জন্য তখনও ভবনেত ভেতর রয়ে গেছেন অপারেটর আহমেদুল্লা। বাইরের গেটে পাহারা বলতে শুধু একজন সান্ত্রী। হঠাৎই আহমেদুল্লা টের পেলেন কারা যেন উপস্থিত হয়েছে তার পেছনে। ঘুরে কিছু দেখার আগেই ক্লোরোফর্মে ভেজানো রুমালটা চেপে ধরা হল আহমেদুল্লার মুখে। কিছুক্ষনের মধ্যে অচৈতন্য হয়ে পড়লেন তিনি। আর তার প্রায় মিনিট খানেকের মধ্যে অম্বিকা চক্রবর্তীর নির্দেশে বিপ্লবী আনন্দ ও দেবব্রত গুপ্তরা বিচ্ছিন্ন করে ফেলল সমস্ত টেলিফোন আর টেলিগ্রাফের তার আর ১০টার মধ্যে ৩০০ টেলিফোন সহ গোটা ভবন আগুনে পুড়ে ছাই। টেলিফোন ভবনে যখন এই নাটকীয় ঘটনা ঘটে চলেছে, তখন ঠিক একই সময়ে চট্টগ্রামের অন্য দুই স্থানে শুরু হচ্ছে আরো সাংঘাতিক দুটি কাজ। চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনের আশেপাশে তখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ক্যাপ্টেন গনেশ ঘোষ আর অনন্ত সিংহের দলবলসহ প্রায় জনা কুড়ি ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির বিপ্লবীরা। আর লাইনের গেট থেকে একটু দূরে গাছের তলায় অপেক্ষা করছেন সাদা পাঞ্জাবি ও ধুতি পরিহিত, পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো পরা আর বুকে ব্ল্যাক ভেলভেটের ব্যাজ সহ ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির প্রেসিডেন্ট মাস্টারদা সূর্য সেন। ঠিক কাঁটায় কাঁটায় মাস্টারদার নির্দেশ মতো রাত ৯ঃ৫৫ মিনিটে শুরু হল অপারেশন। পুলিশ লাইনের গেট ভেঙে, পাহারায় থাকা সমস্ত সান্ত্রীদের বন্দী করে বিপ্লবীরা লুঠ করল মাস্কেট্রি রাইফেল আর কার্তুজ। পুলিশ লাইন ততক্ষনে গমগম করছে 'বন্দেমাতরম' আর 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' ধ্বনিতে। ধীরেসুস্থে লুঠ পর্বের পর আবারও শুরু হল অপেক্ষা। কারণ ক্যাপ্টেন লোকনাথ বল আর নির্মল সেনের দল গেছে রেলওয়ে অক্সালারি ফোর্সের অস্ত্রাগার লুঠ করতে; আর অন্যদিকে ক্যাপ্টেন নরেশ ঘোষ আর দল গেছে ইউরোপিয়ান ক্লাবে, সমস্ত ব্রিটিশ অফিসারদের বন্দী রাখার মিশনে। আন্দাজ রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ এল সেই দুঃসংবাদ। অক্সালারি ফোর্সের অস্ত্রাগার থেকে ফিরে এসে লোকনাথ আর নির্মল খবর দিল যে উদ্দেশ্য নিয়ে তারা গেছিল, সেটা সম্পুর্ন ব্যর্থ। ব্রিটিশদের নতুন রাইফেল ৩'৩ রাইফেল পেলেও তার কার্তুজ আর মেশিন গান তারা সেখানে পায়নি। আসলে বিপ্লবীরা এটা জানতা না যে সামরিক কায়দায় অস্ত্র আর কার্তুজ একই স্থানে রাখা হয় না। ধাক্কাটা সামলে উঠতে না উঠতে নরেশ ঘোষেরাও এসে হাজির পুলিশ লাইনে। এসে তারাও দিল আরেক খারাপ খবর। ১৮ই এপ্রিল গুড ফ্রাইডে হওয়ার কারণে ইউরোপিয়ান ক্লাব বন্ধ। কাজেই কোনো অফিসার আসার প্রশ্নই ওঠে না। ফলে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির মধ্যে এক চরম হতাশা গ্রাস করতে শুরু করল। দলের ক্যাপ্টেনরা বাদ দিয়ে বাকি ৬৪ জন বিপ্লবীই তরুণ যুবক। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার আঠেরোর গন্ডিও পেরোয়নি। কিন্ত এমন একটা সময়ে তো ভেঙে পড়লে মুস্কিল। গত এক বছর ধরে, তিলে তিলে যে প্ল্যান তারা তৈরি করেছে। সময় মিলিয়ে প্রত্যেকটা জায়গা পর্যবেক্ষণ করে হোমওয়ার্ক করেছে, মিশনের জন্য টাকা জোগাড় করে চারখানা গাড়ি, কয়েকটা সাইকেল, কিছু অস্ত্র জোগাড় করেছে- সেটা কি আজকের এই ব্যর্থতা দেখার জন্য। হাল ধরলেন দলপতি মাস্টারদা। মাস্টারদার নির্দেশে পুলিশ লাইন গ্রাউন্ডে পতাকা তোলার দন্ড থেকে খুলে ফেলা হল ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাক। তার জায়গায় সেই রাতেই উত্তোলিত হল ভারতীয় তেরঙ্গা। ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন সূর্য সেন। মাস্টারদা ভরসা জোগালেন দলের তরুণ বিপ্লবীদের- জীবন, সুবোধ, বিনোদ বিহারী, রজত, আনন্দ, দেবব্রত, হিমাংশু; এরকম আরও ৬৪জন তরুণদের। কার্তুজ কম থাকার কারণে সেই রাতেই ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি অন্ধকারে গা ঢাকা দিল চট্টগ্রামের পাহাড়ি জঙ্গলে। পরদিন সকালে পুলিশ লাইনে এসে ব্রিটিশরা বুঝতে পারল পরিস্থিতি কতটা হাতের বাইরে বেরিয়ে গেছে। কারণ তারাও আন্দাজ করতে পারেনি যে ১৯৩০এ দাঁড়িয়ে চট্টগ্রামের কয়েকজন স্বদেশী মাত্র কয়েকঘন্টার মধ্যে চট্টগ্রামের গোটা ব্রিটিশের ভীত নাড়িয়ে দিতে পারে। পরাধীন ভারতের ১৮ই এপ্রিলই সেই একমাত্র দিন যেদিন মাত্র কয়েকঘন্টার জন্য হলেও ব্রিটিশদের হাত থেকে চট্টগ্রামকে মুক্ত করে ফেলেছিল ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, কিছুক্ষনের জন্য স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল দেশের এক প্রান্তে; যাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের উমাতারা হাই স্কুলের সেই শান্ত নিরীহ দেখতে অংকের শিক্ষক, সূর্য সেন। ছাত্ররা যাকে ভালোবেসে 'মাস্টারদা' ডাকত।

Comments
Post a Comment