এ প্রেমকাহিনী হার মানায় ইতিহাসের বাকি প্রেমকাহিনীর থেকে। উনবিংশ শতকের বাঙালিদের মধ্যে এই প্রেমকাহিনী এতটাই আলাদা যে এর পরিণতি হিসেবে আজ আমরা বাঙালীরা গর্ব করে বলতে পারি, "হ্যাঁ, ভারতের প্রথম মহিলা ডাক্তার আমাদেরই বঙ্গনারী"। এই প্রেমকাহিনীর জুটি হলেন কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় (বসু) এবং দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। তবে আজকের লেখাটা দ্বারকানাথের প্রেমকাহিনী নিয়েই, যিনি কাদম্বিনীর পাশে না থাকলে 'প্রথম মহিলা ডাক্তার' এই সম্বোধনটাই বাঙালির কপালে জুটত কি না সন্দেহ। কাদম্বিনীর আগেও দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেম, ধ্যান, জ্ঞান ছিল নারীদের অগ্রগতির প্রতি। আসলে দ্বারকানাথের বরাবরের ইচ্ছে যে বাঙালি মেয়েদের নিয়ে কিছু করবেন, তাদের শিক্ষার ব্যাপারে আরো উন্নতি করবেন। ইচ্ছেটা মূলত জেগেছিল তরুণ বয়সে অক্ষয়কুমার দত্তের একটা প্রবন্ধ পড়ে। আর সেই ইচ্ছে থেকেই ১৮৬৯-র মে মাসে ঢাকার ফরিদপুরের লোনসিন গ্রাম থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করল 'অবলাবান্ধব', নারীদের শিক্ষা ও বিকাশ সম্পর্কিত একমাত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা। আর এই 'অবলাবান্ধব'ই তাকে নারী সমাজের কল্যাণকারী হিসেবে সকলের সামনে পরিচিতি এনে দিল, কোলকাতা ও ঢাকার মানুষ জানল তার 'অবলাবান্ধব'-এর কথা। এমনকি তরুণ ব্রাহ্ম সমাজের সদস্যরাও তার এই উদ্যোগ নিয়ে বেশ আগ্রহী হয়ে পড়ল। যার ফলে ১৮৭০এ দ্বারকানাথ ফরিদপুর থেকে কোলকাতায় ডাক পেলেন ব্রাহ্ম সমাজের পক্ষ থেকে। দ্বারকানাথও 'অবলাবান্ধব' সহ কোলকাতায় এসে যুক্ত হলেন ব্রাহ্ম সমাজের সাথে।
ব্রাহ্ম সমাজের অংশ হয়ে দ্বারকানাথ নারীদের শিক্ষা ও বিকাশ নিয়ে একের পর এক অসাধারণ প্রস্তাব রাখতে শুরু করলেন। ১৮৭৩এর ১৮ই সেপ্টেম্বর নারীদের জন্য আলাদা করে শিক্ষাদানের জন্য দুর্গামোহন দাস, মনমোহন ঘোষ এবং দ্বারকানাথ ২২এর বেনিয়াপুকুর লেনে তৈরি করলেন হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়। শুধু স্কুল নয়, তার সাথে মেয়েদের থাকার জন্য আবাসিক আর সেই আবাসিক চালানোর দায়িত্বের ভার দিলেন মিস অ্যানেটি অ্যাকরয়েডের উপর। কিন্তু ছাত্রীর অভাবে বেশিদিন চলল না সে স্কুল। এরপর দ্বারকানাথ নারীদের উচ্চশিক্ষা যেমন বিজ্ঞান, গণিত নিয়ে পড়াশুনা, নারীদের পর্দাপ্রথার অবসান; এমনকি নারীদের বেশভূষার উন্নতির নিয়েও তার পরিকল্পনা ব্রাহ্ম সমাজের কাছে রাখলেন। কিন্তু দ্বারকানাথ বুঝতে পারেননি যে প্রদীপের নীচেই সবথেকে বেশি অন্ধকার থাকে। তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের নেতা কেশব চন্দ্র সেন নিজে দ্বারকানাথের এই নারীদের উন্নতির দিক নিয়ে এতটা ভাবনাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখলেন না। ফলে সরাসরি নাহলেও পদে পদে দ্বারকানাথ ও তার অনুগামী ব্রাহ্মদের বাধা সৃষ্টি করতে লাগলেন। এরমধ্যেই ১৮৭৬এর ১লা জুন ওল্ড বালিগঞ্জ রোডে দ্বারকানাথরা শুরু করলেন বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়। সেইসময় অন্যদিকে বেথুন স্কুলেরও পরিচালন ক্ষমতা অনেকটাই অচল। ফলে বেথুন স্কুলের মনমোহন ঘোষের উদ্যোগে বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্তিকরণ হল বেথুন স্কুলের। সালটা ১৮৭৮এর ১লা অগাস্ট। কিন্তু ততদিনে ব্রাহ্ম সমাজের অনেকের সাথেই মতবিরোধ শুরু হয়ে গেছে দ্বারকানাথ ও তাঁর অনুগামীদের। ফলে যা হওয়ার শেষ অব্দি তাইই হল- দ্বারকানাথ ও তার সঙ্গে দুর্গামোহন দাস, আনন্দচরণ খাস্তগির, শিবনাথ শাস্ত্রী, রজনীনাথ রায়, এছাড়া আরো কয়েকজন মূল ব্রাহ্ম সমাজ ছেড়ে বেরিয়ে ১৮৭৮এ তৈরি করলেন 'সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ'।
বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় তৈরির অল্পদিনের মধ্যেই বেশ নামকরা হয়ে উঠেছিল নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে। স্বর্ণপ্রভা বসু (আনন্দমোহন বসুর স্ত্রী), সরলা রায় (ডঃ প্রসন্নকুমার রায়ের স্ত্রী), লেডি অবলা বসু (আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর স্ত্রী)- এরকম অনেকেই সেদিন ভর্তি হয়েছিলেন বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে। আর ভর্তি হয়েছিলেন সেই নারী, যাকে পরে তাঁর শিক্ষার অগ্রগতির পাশাপাশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। আগের হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ের মতো বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়েও ছিল মেয়েদের আবাসিক আর সেখানেই পড়াশুনার জন্য থাকতেন ভাগলপুর নিবাসী ব্রজকিশোর বসুর কন্যা কাদম্বিনী। স্কুলের পরিচালন কমিটিতে তখন আনন্দমোহন বসু আর স্কুলের হেডমাস্টার দ্বারকানাথ নিজে। সেসময় মেয়েদের পক্ষে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা দেওয়াটা খুব একটা সহজ ছিল না। অথচ কাদম্বিনী আর সরলার খুব ইচ্ছে তারা এই পরীক্ষা দেয়। ছাত্রীদের মধ্যে এরকম আকাঙ্ক্ষা শুনে এগিয়ে এলেন হেডমাস্টারমশাই নিজে। দ্বারকানাথ তাদের কথা দিলেন যে পরীক্ষায় বসার ব্যাবস্থা করে দেবেন তিনি, কিন্তু শর্ত আছে তাতে। সরলা আর কাদম্বিনীকে যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হবে। সেই মতো অধ্যাপক রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় নিলেন ইতিহাস, অধ্যাপক গ্যারেট নিলেন গণিত, পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কার নিলেন বাংলা আর অধ্যাপক পপ নিলেন ইংরেজির পরীক্ষা। শেষ অব্দি দুজনেই এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও সরলা দাস (বিবাহের পর সরলা রায়) আর প্রবেশিকা পরীক্ষা দেননি। কাদম্বিনী বসু ১৮৭৮এ বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় থেকেই উত্তীর্ণ হলেন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় এবং এখানেও তাঁর তকমা জুটল- 'প্রথম ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশিকায় উত্তীর্ণ মহিলা'। এরপর কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষা থেকে বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ (কোলকাতা মেডিক্যাল কলেজ)- প্রত্যেকটি স্থানে কাদম্বিনী তাঁর লড়াইয়ে সম্পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন দ্বারকানাথের। এই পথচলার মধ্যেই কাদম্বিনীর একরকম শ্রদ্ধা ও অনুরাগের জন্ম হয় তাঁর স্কুলের হেডমাস্টারমশাইয়ের প্রতি। আর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার পরপরই সেই শ্রদ্ধা ও অনুরাগ প্রকাশ পেল বিপত্নিক দ্বারকানাথের সাথে বিবাহের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু সে আরেক কাহিনী।
বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় ছাড়াও ১৮৯০এ তৈরি হওয়া ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের আর্থিক সমর্থন জোগাতেন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। ১৮৭৯তে তিনি বিক্রমপুর সম্মেলনি সভার প্রতিষ্ঠা করেন যাদের দৌলতে বেশ কয়েকটি বালিকা বিদ্যালয় তৈরি হয়েছিল বিক্রমপুরে। ১৮৮২তে দ্বারকানাথের উদ্যোগেই মহিলারা প্রথম কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষায় বসার সুযোগ পায়, যার ফল স্বরূপ প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট হিসেবে উঠে আসে মিস কাদম্বিনী বসু ও মিস চন্দ্রমুখি বসুর নাম। মেরি কারপেন্টার থেকে পন্ডিতা রমাবাই- প্রত্যেকের কাছে দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় 'নারী জাতির জন্য এক উজ্জ্বল উদাহরণ' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়। ১৮৮৫তে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তৈরি হওয়ার পর 'ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন'এর প্রতিষ্ঠাতা আনন্দমোহন বসু ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে যোগদানের অনুরোধ জানান দ্বারকানাথকে। দ্বারকানাথই প্রথম যিনি জাতীয় স্তরে ভারতীয় মহিলাদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব রাখেন। মূলত তাঁর এই প্রস্তাবের ফলেই ১৮৮৯তে বম্বেতে কংগ্রেসের যে ৫ম অধিবেশন হয়, সেখানে দশজন মহিলা কংগ্রেসের প্রতিনিধী হিসেবে অংশ নেন, যার মধ্যে কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় নিজে এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবীও ছিলেন। অথচ সারাজীবন মহিলাদের অগ্রগতি নিয়ে চিন্তা করা এই মানুষটার কপালে জুটেছিল নানান লাঞ্ছনা ও অপমান। ব্রাহ্ম সমাজ থেকে তৎকালীন কুলীন সমাজ- প্রত্যেকে তাকে জর্জরিত করে তুলেছিল 'নারী লোভী' মানুষ হিসেবে। অথচ জীবনের শেষ দিন অব্দি তিনি চিন্তিত ছিলেন নারীদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিকাশ নিয়ে। তাদের কথা ভেবে রচনা করেছেন একের পর এক প্রবন্ধ, পত্রিকা, লেখা- আরও কত কি! অথচ নারী জাতির অগ্রগতির সাথে রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগরের পাশাপাশি আজকের ইতিহাসের পাঠ্যবই থেকে একরকম হারিয়েই গেছেন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। চিরকাল শুধু রয়ে গেছেন 'প্রথম ভারতীয় মহিলা ডাক্তার' খেতাবের আড়ালের মানুষটা।

Comments
Post a Comment