Skip to main content

হুগলীর প্রথম বণিকরা

 

আমরা যারা একটু-আধটু ইতিহাস ভালোবাসি, তাদের এটা একবাক্যে মেনে নিতে কোনো কষ্ট হবে না যে বাংলা বলুন, বা ভারতে বলুন বা বিশ্বেই বলুন এতবড় কলোনিয়াল হ্যাংওভারের উদাহরণ হিসেবে সবার প্রথম হুগলীর কথাই মাথায় আসবে। শুধুমাত্র হুগলী স্থান হিসেবে নয়, সমগ্র হুগলী জেলাটাই ইতিহাসের এক বিরাট পীঠস্থান, এক আদর্শ নৃতত্ত্বশালা। শুধু কলোনিয়াল ইতিহাসের কথা বললেও একে কম বলা হবে। বরং হুগলী হল এমন একটা জেলা যেখানে দেশী থেকে বিদেশী, হিন্দু থেকে ক্রিশ্চান, মুসলিম থেকে বৌদ্ধ- সমস্ত কিছুরই এক ‘মহামানবের সাগর তীর’ বলে একে আখ্যা দেওয়া যায়। অবশ্য এ কথা ভাবলে ভুল ভাবা হবে যে এই ইউরোপিয়ান কলোনিগুলি তৈরি হওয়ার আগে থেকেই হুগলী নামকরা। ভারতের বাকি সমস্ত জায়গা ছেড়ে ইউরোপিয়ানরা যে আগে হুগলীতে ছুটে এসেছিল সেটা কিন্তু আদপে সপ্তগ্রাম বন্দরের জন্যই, যেখানে আজকে বন্দরের চিহ্ন মুছে গিয়ে আদিসপ্তগ্রাম বলে পরিচিত। মূলত এই আদিসপ্তগ্রামেই ছিল সুবে বাংলার সবথেকে বড় বন্দর। এখনকার মজে যাওয়া সরস্বতী নদীর সাথে ভাগীরথী, অর্থাৎ কিনা গঙ্গার সরাসরি যোগাযোগই কিন্তু সপ্তগ্রামকে আদর্শ বাণিজ্য-বন্দর গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। কারণ যেসব বিদেশী জাহাজ বঙ্গোপসাগর হয়ে বাণিজ্যের জন্য গঙ্গাবক্ষে ঢুকত, তাদের পক্ষে সপ্তগ্রামে আসাটা ছিল খুবই সহজ। পঞ্চদশ শতাব্দী অব্দি কিন্তু এই সপ্তগ্রাম আর তার সামান্য উপরে ত্রিবেণী ছাড়া গঙ্গার ধার ঘেঁষে হুগলীর আর কোনো স্থান এত জনপ্রিয় ছিল না। হুগলীতে পশ্চিমের দেশ থেকে ইউরোপিয়ান বণিকরা আসার আগে অব্দি বাংলায় বিদেশী বলতে যাদের যাতায়াত ছিল, তারা হয় তুর্কি অথবা পারসী ব্যাবসায়ী। তাদের জাহাজগুলি মূলত সপ্তগ্রাম, ত্রিবেণী হয়ে পাটনা অব্দি যাতায়াত করত ব্যাবসার কাজেই। এদের কেউই কিন্তু হুগলী বা বাংলায় উপনিবেশ তৈরি করার কথা ভাবনাতেও আনেনি। ব্যাবসার সূত্রে এ দেশে এলেও আমরা দেখতে পাই ১৫০৫ থেকেই মোটামুটি সরকার তৈরি করে পর্তুগীজরা ভারতের দক্ষিণ উপকূলে বেশ জমিয়ে উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু বাংলার উপর, বিশেষ করে সপ্তগ্রামের উপর তাদের নজর পড়ল ১৫৩৩এর দিকে। বাংলায় তখন হুশেন শাহীর রাজত্ব। তার রাজত্বের সময়েই পাঁচটি জাহাজ আর দুশো লোক নিয়ে অ্যাফোনসো ডি মেলো উপস্থিত হলেন হুশেন শাহের দরবারে। উদ্দেশ্য একটাই- বাণিজ্য। কিন্তু হুশেনকে উপহার দিতে গিয়ে গোল পাকাল পর্তুগিজরা। বাংলাদেশেরই তাদেরই লুঠ করা চোরাই মাল হুশেনকে গছিয়ে দিল অ্যাফোনসো। কার্যত হিতে বিপরীত হল এই ঘটনায়। হুশেন তাদেরকে সকলকেই কারাগারে বন্দী করলেন। তৎক্ষণাৎ এই খবর পেয়ে গোয়ার পর্তুগিজ গভর্নর নান ডি কুনহা তার বিশ্বস্ত লোক অ্যান্টেনিও ডি সিলভা মেজেসকে দ্রুত পাঠালেন গৌড়ে হুশেন শাহের দরবারে। কিন্তু এক মাস কেটে গেলেও মেজেসকে কোনোরকম পাত্তা দিলেন না সুলতান। বাংলায় তো তখন শুধু সপ্তগ্রাম নয়, ছিল আরেক বিখ্যাত এবং সবথেকে বড় বন্দর- চট্টগ্রাম। সুলতানের থেকে অপমানিত হয়ে রাগের চোটে মেজেস তখন চট্টগ্রাম অবরোধ করে বসলেন। অন্যদিকে গোয়ার গভর্নরের থেকে নির্দেশে পেয়ে ডিয়েনো রিবেলো সোজা চলে এলেন সপ্তগ্রাম বন্দরে। এবার সপ্তগ্রামেরও দখল নিয়ে বসল পর্তুগিজরা। পর্তুগিজরা ভেবেছিল সুলতান হয়তো বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করে বসবেন। কিন্তু সেরকমটা কিছুই ঘটল না। বরং সেসময়টা দিল্লীর মুঘলদের থেকে আক্রমণের ভয়ে হুশেন শাহ পর্তুগিজদের আর চটাতে চাননি। উলটে ভেবেছিলেন এই সময়টা তাদের হাতে রাখলে আখেরে লাভটা বাংলার রাজত্বের জন্যই হবে। হুশেনের পরবর্তী ও তার রাজত্বের শেষ সুলতান গিয়াসুদ্দিন মামুদ শাহও দরাজহস্ত ছিলেন পর্তুগিজদের প্রতি, যার ফলে খুব সহজেই পর্তুগিজরা অনুমতি পেয়ে গিয়েছিল চট্টগ্রাম এবং সপ্তগ্রাম দুটি স্থানেই তাদের বাণিজ্য কুঠি তৈরি করার ফরমান। আর এই ফরমানের হাত ধরেই বাংলার মানুষ প্রথম মুখোমুখি হল পশ্চিমের সাদা চামড়ার মানুষ পর্তুগিজদের। আর তাদের সেই দেখানো পথ ধরেই হুগলীতে ক্রমে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করল ইউরোপের বাকি দেশগুলিও। ১৫৩৫ খ্রীঃ-র মধ্যেই পর্তুগিজদের বাণিজ্য কলোনি পাকাপাকি হয়ে গেল সপ্তগ্রামে। পাশাপাশি সুলতানের সাথে বন্ধুত্বও জমে উঠল তাদের আর অ্যাফোনসো হয়ে উঠলেন সুলতান মামুদ শাহের পরামর্শদাতা। কিন্তু সে সুখের দিন বেশিদিন বজায় রইল না পর্তুগিজদের কপালে। এরপর যখন শের শাহ সুবে বাংলা আক্রমণ করে বসলেন, তখন পর্তুগিজরা বাধ্য হল সপ্তগ্রাম থেকে আবারও গোয়ায় চলে যেতে। অন্যদিকে গিয়াসুদ্দিন মামুদ শাহও পরাজিত হয়েছেন শের শাহের হাতে। কিন্তু ১৫৫০ খ্রীঃ-তে শের শাহের রাজত্বের যখন অবসান হল, তখন পর্তুগিজদের সামনে আর কোনো বাধা রইল না। ফলে আবারও পুরনো কুঠি হুগলীতে ফিরে এল পর্তুগিজরা।     


Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...