Skip to main content

শয়তানের হত্যা- আর্নি চেনি জনসন মামলা


ইতিমধ্যে হয়তো অনেকেই দেখে ফেলেছেন The Conjuring 3। পর্দায় লোরাইন এবং এড ওয়ারেনের প্যারানরমাল কেস ফাইলের মধ্যে থেকে প্রতিবারই এধরনের সত্যি ঘটনা দেখে আমরা রোমাঞ্চিত হই বারবার। তবে The Conjuring 3-তে এবারে যে ঘটনাটি দেখা গেছিল, সেটা বিশ্বের অপরাধ জগতের কেসের মধ্যে একটা অদ্ভুত কেস হয়ে থেকে গেছে, অপরাধ জগতের ইতিহাসে যার পোষাকি  'The Devil Made me Do It'। 

১৯৮১র ১৬ই ফেব্রুয়ারি। আর্নি চেনি জনসনের নামটা আমেরিকার কনেটিকেট স্টেটের ব্রুকফিল্ডে বেশ হইচই ফেলে দিল। ঘটনাটা আর কিছুই নয়; ভদ্রলোক তাঁর বাড়ির মালিক অ্যালান বোনোকে হত্যা করেছে। একেবারে ওপেন এন্ড শাট কেস। সুতরাং ৪০ বছর বয়স্ক মানুষকে খুন করার অপরাধে আর্নিকে গ্রেপ্তার করতে কোনো বাধাই রইল না পুলিশের। যথারীতি কেসও উঠল কোর্টে। কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আর্নি এমন এক বয়ান দিল, যার জন্যই রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন আর্নি। তাঁর কেস The Trial of Arne Cheyenne Johnsonকে সংবাদমাধ্যম পরিচিতি দিল The Devil Made me Do It হিসেবে।

আসলে কি ঘটেছিল সেই ১৯৮১র ১৬ই ফেব্রুয়ারি? আর্নি চেনি জনসন একটি ৫ ইঞ্চির লম্বা ছোরা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল অ্যালানকে। ঘটনাটা আরো উল্লেখযোগ্য এই কারণে যে ১৯৩ বছরের মধ্যে ব্রুকফিল্ডে সেটাই ছিল প্রথম হত্যা। শুনতে অবাক লাগলেও এই কেসের পরতে পরতে চমক লুকিয়ে আছে। অথচ জনসনের এই হত্যা করার আগে তাঁর বিরুদ্ধে না ছিল কোনো অভিযোগ, না ছিল কোনো অপরাধের ইতিহাস। কিন্তু আদালতে দাঁড়িয়ে জনসন স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন যে এই হত্যার আগে থেকেই তাঁর মধ্যে এমন কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল, যা নিয়ে তিনি নিজেই বেশ ধন্দে পড়ে গেছিলেন। আর এই পরিবর্তনের শুরুর পেছনে ছিল আর্নির বাগদত্তা ডেবি গ্ল্যাটজেলের ১১ বছরের ভাই ডেভিড।

ঘটনার শুরু ১৯৮০র গ্রীষ্মকাল থেকে। এইসময় থেকে ডেভিড দাবী করতে থাকে যে সে মাঝেমধ্যেই একজন বৃদ্ধকে চোখের সামনে দেখে। বৃদ্ধ তাকে নানাভাবে বিরক্ত করে, ভয় দেখায় ডেভিডকে। আর্নি আর ডেবি প্রথমে ভেবেছিল যে ডেভিড তার পড়াশুনাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এসব গল্প তৈরি করছে। কিন্তু যেমন ভাবা হয়েছিল, বাস্তবে সেরকমটা হল না। উল্টে দিনের পর দিন ডেভিডের এই ভয় বেড়েই চলল, তার সাথে শুরু হল ডেভিডের অস্বাভাবিক আচরণ। হাঁটাচলার লক্ষন থেকে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর, তার সাথে অস্বাভাবিক দৈহিক শক্তির প্রকাশ পেতে থাকল তার মধ্যে। যেন সেসব কাজ ডেভিড নিজে করছে না। অদৃশ্য কেউ তাকে দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে সেসব। ডেভিডের বাড়ির লোকেরা কাছের চার্চ থেকে পাদ্রিকে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করাতে চাইল। কিন্তু ফল কিছুই হল না। উপায় না দেখে অবশেষে ডাক পড়ল অলৌকিক বিশেষজ্ঞ এড ও লোরাইন ওয়ারেনের। 

এড-লোরাইনের কাছে ডেভিড জানিয়েছিল যে একজন সাদা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধের কথা, যে তাকে প্রায়ই ভয় দেখাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ডেভিড সত্যি বলছে কিনা সেটা যাচাই করতে গিয়ে এড আর লোরাইন একট রাত কাটিয়েছিল ডেভিডেদের বাড়িতে, আর সেদিনই সকলে শুনেছিল বাড়ির চিলেকোঠার ঘর থেকে ভেসে আসা নানা অদ্ভুত শব্দ। এড-লোরাইন স্পষ্ট জানিয়েছিল যে ডেভিডের কেসটা প্যারানরমাল ছাড়া আর কিছুই না। অন্যদিকে মনোবিদেরা দাবী করেছিলেন যে ডেভিডের learning disabilityর জন্যই সে এইসব আচরণ করছে। অবস্থা গতিক বুঝে আর্নিও ততদিনে তার বাগদত্তার বাড়িতে মাঝেমধ্যে থাকা শুরু করেছিল। কিন্তু ডেভিডের এই অলৌকিক শক্তি এবার থেকে শুধু রাতে নয়, দিনেও প্রকাশ পেতে শুরু করল। না দেখে জন মিল্টনের 'প্যারাডাইস লস্ট' এবং বাইবেল থেকেও ডেভিড লাইনের পর লাইন বলে যেতে থাকত, এক অদ্ভুত কন্ঠে।  পরে আর্নি আদালতে জানিয়েছিল যে ১৯৮০র অক্টোবর থেকে সেই অলৌকিক শক্তি তাকেও বিরক্ত করা শুরু করে। উপায়ন্তর না দেখে আর্নি ডেভিডের অদৃশ্য শক্তির কাছে আকুতি জানিয়েছিল যেন সে ডেভিডকে ছেড়ে আর্নিকে গ্রহণ করে।

অবশেষে এল সেই দিন। ১৯৮১র ১৬ই ফেব্রুয়ারি। ঘটনার আগে আর্নি আর তার বাড়ির মালিক অ্যালান পরস্পর ছিল বন্ধু। পারতপক্ষে স্থানীয় কেউ কখনও তাদের মধ্যে কোনো বিবাদ দেখেনি। কিন্তু ঘটনার দিন আন্দাজ সন্ধ্যে ৬ঃ৩০এ আর্নি আর অ্যালানের মধ্যে বেশ কথা কাটাকাটি শুরু হয়। এর মধ্যেই আর্নি হঠাৎই ছোরা বের করে অ্যালানের বুকে ও পেটে বেশ কয়েকবার আঘাত করে। ঘটনাস্থলেই মারা যায় অ্যালান। হত্যার এক ঘন্টার মধ্যে পুলিশ আর্নিকে গ্রেপ্তার করে। হত্যার কারণ হিসেবে পুলিশ জানিয়েছিল যে আর্নির বাগদত্তা ডেবিকে নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। কিন্তু ওয়ারেন দম্পতি জানিয়েছিল সম্পূর্ণ অন্য কথা।

আর্নির কেসের তদন্তে উঠে আসে ডেভিডের অলৌকিক ঘটনার কথা। ডেভিডের সেই অদৃশ্য শক্তিই আর্নিকে এই হত্যা করতে বাধ্য করেছে বলে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিল আর্নি। কিন্তু ওয়ারেন দম্পতি আর্নির সপক্ষে বহু অলৌকিক প্রমাণ আদালতে পেশ করলেও বিচারপতি ডেবিকে নিয়ে রেষারেষিরর ঘটনাতেই অবিচল থাকে।    

জনসনের অ্যাটর্নি মার্টিন মিনেলা তাঁর মক্কেলের সাপেক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন, "আদালত যখন ভগবানের পক্ষেও বিচার চালিয়েছে, তেমনই এবারে শয়তানের পক্ষেও এই বিচার চালানো উচিৎ"। ইতিহাসে এই প্রথম আমেরিকান আদালতে অলৌকিক ঘটনাকে প্রাধান্য দিয়ে বিচার চলেছিল। বলাই বাহুল্য বিচারপতি রবার্ট ক্যালাহান মিনেলার এই যুক্তিকে খারিজ করে দেন। পাদ্রী ডিওসিজ অফ ব্রিজপোর্ট, যিনি ডেভিডের ব্যাপারে খুব সাহায্য করেছিলেন; তিনিও আর্নির সপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন আদালতে। যদিও আদালতের পক্ষ থেকে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে জনসমক্ষে কোনো তথ্য প্রকাশ না করার জন্য। কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে আর্নির হত্যার ঘটনাটি মিনেলা অলৌকিক ঘটনার দিকেই বেশি করে জোরদার করে তুলতে থাকেন। কিন্তু সে যুক্তিও ধোপে না টিকলে শেষ অব্দি মিনেলা আর্নির সপক্ষে Self Defenceএর যুক্তির আবেদন জানায়। ফলস্বরূপ ১৯৮১র ২৪শে নভেম্বর আর্নির কারাদন্ডের আদেশ হয়। যদিও জেলে ভালো আচরণের জন্য পাঁচ বছরের মধ্যেই আর্নি মুক্তি লাভ করে এবং শেষ অব্দি ডেবির সাথেই বিবাহ হয়।

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...