পর্তুগিজরা দ্বিতীয়বারের জন্য হুগলী ফিরে এসেই কিন্তু জোরকদমে বাণিজ্যের কাজে চূড়ান্ত অগ্রগতি ঘটিয়েছিল। ১৫৬৭তে সীজার ফ্রেডরিখ সপ্তগ্রাম বন্দরে এসে দেখেছিলেন পর্তুগিজ বাণিজ্যের রমরমা। মোটামুটি বাংলা থেকে কি কি রপ্তানি করত পর্তুগিজরা? তালিকায় ছিল বাংলার মসলিন, ফলের মোরব্বা, কমলালেবু, হরীতকি, এমনকি বাংলার মৃৎশিল্পও। কিন্তু সপ্তগ্রাম নিয়ে সমস্যাটা শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন থেকেই; কারণ ততদিনে সরস্বতী নদীতে পলি জমতে শুরু করে দিয়েছে যার ফলে পর্তুগিজ জাহাজ শুধুমাত্র গঙ্গার মুখে বেতড় গ্রাম অব্দিই যেতে পারত। ফলে পর্তুগিজরা সপ্তগ্রামের আশেপাশে তাদের বাণিজ্যনগরীর জন্য আদর্শ স্থান খুঁজতে শুরু করল। মজার ব্যাপার হল এই যে ‘হুগলী’ নামটাও কিন্তু পর্তুগিজদের দেওয়া, কারণ তারা আসার আগে অব্দি ‘হুগলী’র কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সেসময় গঙ্গার ধারে প্রচুর হোগলা গাছ দেখা যেত বলেই সেখান থেকেই এর নাম হয়েছে ‘হুগলী’। ১৭শতাব্দিতে অনেক চিঠিপত্র ও কাগজে হুগলীকে ‘ওগোলি’, ‘ওগলি’, ‘গোলিন’, ‘হিউগলি’ এরকম নামে চিহ্নিত করতে দেখা গেছে। ১৫৩৭তে সাস্প্রায়ো সপ্তগ্রামের কাছেই পর্তুগিজদের যে বাণিজ্য উপনিবেশ গড়ে তুলেছিলেন, মূলত সেটিকেই পর্তুগিজরা নাম দিয়েছিল ‘হুগলী’ বা ‘গোলিন’। এর মধ্যে বাবুগঞ্জ, ব্যান্ডেল, পিপুলপাতি নামে বেশ কয়েকটি গ্রাম ছিল। আর মূলত সরস্বতী নদী মজে যাওয়ার কারণে সপ্তগ্রাম থেকে পর্তুগিজরা তাদের বাণিজ্যবন্দর সরিয়ে নিয়ে আসে এই গোলিন উপনিবেশে, যার ফলে এই বন্দর থেকেই এই স্থানের না হয় ব্যান্ডেল।
এতদিন অব্দি শুধু বাণিজ্যবন্দর হিসেবে হুগলী পরিচিতি পেলেও ১৫৭১এ সম্রাট আকবর পর্তুগিজদের পাকাপাকিভাবে নগর তৈরি করার অনুমতি দিলে ব্যান্ডেল ও সপ্তগ্রামসহ আশেপাশে গ্রামাঞ্চল পর্তুগিজদের উপনিবেশে পরিণত হল। পাকাপাকিভাবে বসবাস করার পাশাপাশি পর্তুগিজ ধর্মযাজকরাও এখানে ধর্ম প্রচারের কাজে লেগে পড়লেন। ১৫৭৯তে পর্তুগিজরা আকবরের অনুমতি নিয়েই হুগলীতে তাদের দুর্গ আর ব্যান্ডেল বন্দরকেই তাদের মূল বন্দর হিসেবে গড়ে তোলে। এর ঠিক পরের বছর থেকেই ক্যাপ্টেন পেদ্রো তাভারেস আকবরের থেকে ক্যাথোলিক ধর্ম প্রচার আর গির্জা তৈরির অনুমতিও পেয়ে যায়। শেষ অব্দি ১৫৯৯তে ব্যান্ডেলে পর্তুগিজরা তৈরি করল দ্য ব্যাসিলিকা অফ দ্য হোলি রোজারি, ওরফে ব্যান্ডেল চার্চ; যা কিনা বাংলার মধ্যে সবথেকে প্রাচীন গির্জা। তবে পর্তুগিজদের ব্যাবসার থেকে সবথেকে বেশি মন ছিল দস্যুবৃত্তিতে। আকবর বরাবরই পর্তুগিজদের প্রতি দুর্বল ছিল বলেই তারাও সেও সুযোগ নিতে কার্পণ্য করেনি। গঙ্গার বক্ষ দিয়ে কোনো নৌকো গেলেই জোর করে তাদের থেকে কর আদায় করা থেকে নৌকো করে গঙ্গার দুই পাড়ে বোম্বেটেবৃত্তি, মানুষ হত্যা, শিশু ও মেয়েদের ধরে কালিকটের বাজারে বিক্রি করে দেওয়া- সবই চালাতে লাগল অবাধে। যার কারণে ভাগীরথীর নতুন নাম হয়ে গেল ‘দস্যু-নদী’।
আকবরের অনেক পরে যখন শাহজাহান সম্রাট হয়ে দিল্লীর গদিতে বসলেন, তখন বাংলার পর্তুগিজদের শাসন করার জন্য বাংলার শাসনকর্তা কাশিম খাঁকে নির্দেশ দিলেন তিনি। ১৬৩২এ কাশিম খাঁ সেইমতো সম্রাটের নির্দেশে হুগলী দখল করে পর্তুগিজদের দুর্গ দখল করে ফেলল, আগুনে পুড়িয়ে দিল তাদের সাধের ব্যান্ডেল চার্চ। ক্রোধে উন্মত্ত সম্রাট নিজেও আদেশ দিলেন চার্চের পাদ্রী দা ক্রুজকে মত্ত হাতির পায়ের তলায় ফেলে হত্যা করার জন্য। কিন্তু কি আশ্চর্য! হত্যা করার বদলে সেই হাতি শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে আদর করতে লাগল দা ক্রুজকে। শাহজাহান এই অবাক কান্ড দেখে মুক্তি দিলেন সকল পর্তুগিজ বন্দীদের। হুগলী আর ব্যান্ডেল থেকে তাদের উপনিবেশের অনুমতি নিয়ে নিলেও ব্যান্ডেল চার্চকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য খরচ দিলেন তিনি। এরপর ১৬৬০এ গোমেজ দে সেতো নতুন করে ব্যান্ডেল চার্চ আবারও তৈরি করলেন, যেটি উৎসর্গ করা হল মাদার মেরির নামে। বর্তমানে ব্যান্ডেল চার্চ হিসেবে আমরা এই ১৬৬০এর গির্জাটিকেই দেখে আসছি। শুধু তাইই নয়, দা ক্রুজের সেই অদ্ভুত ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতিবছর ‘ডোমিংগো দা ক্রুজ’ নামে এক বিশেষ উৎসবও পালন করা হয়ে থাকে এখানে। ১৬৫৫র আরেকটি অদ্ভুত কথা বলে ব্যান্ডেলের প্রসঙ্গে ইতি টানব। সেই বছর বঙ্গোপসাগরে এক ভয়ংকর ঝড়ের কবলে পড়ে এক পর্তুগিজ জাহাজ। প্রাণে বাঁচতে জাহাজের ক্যাপ্টেন ও বাকি যাত্রীরা মাদার মেরির প্রার্থনায় আকুতি জানায়। দৈববলেই নাকি অন্য কারণেই হোক, সে যাত্রায় জাহাজটি সেই বিপদের থেকে উদ্ধার পায়। এর ফলে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ জাহাজের সেই ক্যাপ্টেন জাহাজের সবথেকে বড় মাস্তলটি মাদার মেরির উদ্দেশ্যে দান করেন ব্যান্ডেল চার্চে, যেটি আজও সংরক্ষন ও সংস্কারের জন্য দাঁড়িয়ে আছে চার্চের সীমানার মধ্যেই।

Comments
Post a Comment