বর্তমান
সময়ে দাঁড়িয়ে এই চিহ্নটার সাথে প্রায় দৈনিকভাবে পরিচিত হয়ে পড়েছি। ওষুধের দোকান থেকে
হাসপাতাল, টিভির চ্যানেল থেকে অ্যাম্বুলেন্স- সর্বত্রই দেখা যায় একে। সামান্য একটা
লাল ক্রস চিহ্ন। কিন্তু সকলের কাছে সে জীবনের ইঙ্গিত। আর আজ ৮ই মে তারই দিন- বিশ্ব
রেড ক্রস দিবস।
রেড
ক্রসের জন্ম আজ থেকে বহুবছর আগে, ১৮৫৯তে, যার জন্মের প্রেক্ষাপটে রয়েছেন হেনরী ডুনাট।
জন্মসূত্রে স্যুইস হলেও থাকতেন ইটালির সোলফেরিনোতে। সে বছর ইটালির সোলফেরিনোতে চলছে
এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ; অস্ট্রিয়ার সম্রাটের বিরুদ্ধে ফ্রান্স-সার্ডিনিয়ান মিত্রজোটের যুদ্ধ।
ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে প্রায় ৪০,০০০এর উপর সৈনিক তখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই আহত হয়েছে, তাঁর
মধ্যে বহু সৈনিক মৃত। অথচ সৈন্যবাহিনীর নিজেদের কোনো সঠিক মেডিক্যাল টিম নেই যারা আহত
সৈনিকদের সামান্য ফার্স্টএড-টুকু করতে পারবে; চিকিৎসার কথা দূরঅস্ত। সৈন্যদের এরকম
দুর্দশা দেখে নিরপেক্ষভাবে এগিয়ে এলেন ডুনাট। ডুনাটের পরিকল্পনা মেনে স্থানীয় বাসিন্দাদের
নিয়ে তৈরি হল যারা আহত সৈনিকদের চিকিৎসা থেকে সেবা শুশ্রূষা এমনকি খাওয়া-দাওয়ার অব্দি
ব্যাবস্থা করতে পারবে। পরবর্তীকালে এই অসাধারণ কাজের জন্য বিভিন্ন ত্রান সংস্থার পক্ষ
থেকে ডুনাটকে জাতীয় ত্রান সংগঠন প্রতিষ্টা করার আমন্ত্রন জানানো হয় এবং অনুরোধ করা
হয় যতদিন যুদ্ধ চলবে ততদিন অব্দি তিনি ও তাঁর সংগঠন যেন আহত সৈনিকদের সেবার কাজে নিয়োজিত
থাকেন।
১৮৬২তে
ডুনাট ‘মেমোয়ার অফ সোলফেরিনো’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন যেখানে সোলফেরিনোর ভয়াবহ যুদ্ধের
বিবরণের পাশাপাশি কয়েকটি প্রস্তাব রেখেছিলেন, যার মধ্যে প্রথমটি হল, যুদ্ধকালীন একটি
স্থায়ী ত্রান সংস্থা তৈরি করা এবং দ্বিতীয়টি হল এমন একটি সরকারী চুক্তি তৈরি করা যা
সংস্থাটিকে নিরপেক্ষভাবে সকলকে সাহায্য করার স্বীকৃতি দেবে। ডুনাটের এই প্রস্তাবের
উপর ভিত্তি করেই ১৮৬৪তে জেনিভাতে একটি কনভেনশন ডাকা হয়, যেখানে চারটি চুক্তি ও তিনটি
বাড়তি প্রোটোকল গঠিত হয় যা যুদ্ধে মানবিক আচরণ বজায় রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল। অবশ্য
এই প্রোটোকল তৈরি হওয়ার আগেই ১৮৬৩র ৯ই ফেব্রুয়ারিতে ডুনাট সহ পাঁচজন সদস্যদের নিয়ে
প্রতিষ্ঠিত হল International Committee for Relief to the Wounded যা পরবর্তীকালে নাম
বদলে দাঁড়ায় International Committee of the Red Cross। কমিটির প্রতীক হিসেবে নির্ধারিত
হয়েছিল সাদা প্রেক্ষাপটের উপর লাল একটি ক্রস চিহ্ন; ঠিক স্যুইজারল্যান্ডের পতাকার বিপরীত
নকশা। সেই একই বছরে ১২ই অগাস্ট জেনিভা কনভেনশনে ১২টি দেশের সরকার চুক্তিগুলিতে সই করে
রেড ক্রসকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে সমস্ত সৈনিকদের চিকিৎসা পরিষেবা ও সেবা শুশ্রূষা
করার জন্য সমর্থন জানায়। ১৯০১এ ডুনাট তাঁর প্রথম প্রস্তাবের জন্য ফ্রেডেরিক প্যাসির
সাথে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান। পরে International Committee of the Red Cross উপর
ভিত্তি করে পরে ১৯১৯এ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে প্যারিসে তৈরি হয় International
Federation of Red Cross and Red Crescent Societies (IFRC)। আমেরিকান রেড ক্রস ওয়ার
কমিটির প্রেসিডেন্ট হেনরী ডেভিসনই প্রথম এই তৈরির পরিকল্পনা করেন, যা পরে ১৯৮৩তে গিয়ে
নামকরণ হয় League of Red Cross and Red Crescent Societies। প্রথমদিকে IFRC তৈরির মুখ্য
উদ্দেশ্য ছিল চার বছরের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের চিকিৎসা ব্যাবস্থার আয়োজন করে।
পরবর্তীকালে সেটা ক্রমশ সৈনিকদের থেকে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পরিষেবার মধ্যেও অন্তর্গত
হয়। আজকের আন্তর্জাতিক রেড ক্রস দিবস পালিত হয় সেই মানুষটা, হেনরী ডুনাটের জন্মদিবস
৮ই মে-কে মনে রেখে যিনি আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে বুঝিয়ে দিয়ে গেছিলেন শত্রু হোক বা
মিত্র, প্রত্যেক আহত মানুষের সমান চিকিৎসার দরকার।

Comments
Post a Comment