Skip to main content

'বাংলার গ্রেস'- সারদারঞ্জন রায়।


তাকে বলা হত বাংলার ক্রিকেটের জনক। আর সেই কারণেই সারাজীবন 'বাংলার গ্রেস' হিসেবেই বাঙালির কাছে পরিচিতি পেয়ে এসেছিলেন সারদারঞ্জন রায়; বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর দাদা। অবিভক্ত বাংলার কিশোরগঞ্জ জেলার মধ্যে কটিয়াদি উপজেলার মশুয়া গ্রামে রায় পরিবারের মধ্যে এ হেন ক্রিকেট নিয়ে মেতে ওঠা সারদারঞ্জন যে এককালে বাঙালীর ক্রিকেটে এমন কেউকেটা হয়ে উঠবেন, কে জানত! সারদারঞ্জনের বাল্যজীবনে শিক্ষা শুরু ময়মনসিংহের মাইনর জেলা স্কুলে। তারপর সেখান থেকে ঢাকা হাই স্কুল ও পরে ঢাকা কলেজে।  

যে সময়ের কথা বলছি, কোলকাতা ছিল তখন ব্রিটিশদের রাজধানী। কোলকাতার গড়ের মাঠে তখন সাহেবদের চুটিয়ে ক্রিকেট খেলা চলছে সকাল বিকেল। বাঙালীরা অবশ্য তখনও ক্রিকেটের সাথে প্রায় পরিচিত নয় বললেই চলে। যদিও ততদিনে ইন্দোর, পাটিয়ালা, রাজপুতানার মহারাজাদের কাছে ক্রিকেট বিনোদনের অন্যতম অঙ্গ। আর কোলকাতার পাশপাশি ঢাকা শহরেও তখন লেগেছে সাহেবিয়ানার ছোঁয়া। কলেজের অবসরে ক্রিকেট খেলা দেখতে ঢাকার সদর গ্রাউন্ডে প্রায়ই চলে আসতেন সারদারঞ্জন। ছোটো থেকেই গ্রামের জল হাওয়ায় বেড়ে উঠেছিলেন বলেই হয়তো তার মনটা ছিল উন্মাদনায় ভরপুর। তার উপর সাহেবদের ক্রিকেটও তখন ভারতীয় নেটিভদের কাছে এক্কেবারে নতুন। ফলে সাহেবদের এই নতুন খেলার প্রেমে পড়লেন সারদারঞ্জন। তার সমসাময়িক কটিয়াদির মানুষেরা বলেছিলেন যে গ্রামের মেঠো রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময়েও নাকি সারদার এক হাতে থাকত ক্রিকেট ব্যাট, অন্য হাতে বই।  ক্রমে পড়াশুনার বইয়ে মন না বসলেও ক্রিকেটের নিয়ম সংক্রান্ত বই, ক্রিকেট খেলার পদ্ধতীর বই পড়ার নেশায় পেল তাকে। যেখান থেকে পারতেন, ক্রিকেটের উপর বই ঠিক খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসতেন। শুধু তাই নয়, পড়াশুনার ফাঁকে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট নিয়ে থিয়োরি ক্লাশও নিতে শুরু করলেন সারদা। ততদিনে ১৮৮০তে ক্রিকেটের দুনিয়ায় শুরু হয়ে গেছে অ্যাশেস টুর্নামেন্ট। সারদা এবার ভাবলেন যে আর শুধু থিয়োরি নয়, এবারে প্র্যাকটিকালের সময়। ক্রিকেটের উন্মাদনা সারদারঞ্জনকে সরাসরি খেলার মাঠে নিয়ে আসল। ঢাকায় থাকতে সারদারঞ্জন তার চার ভাই- উপেন্দ্রকিশোর, মুক্তিদারঞ্জন, কুলদারঞ্জন আর প্রমদারঞ্জনকে নিয়ে তৈরি করলেন ঢাকা কলেজ ক্রিকেট ক্লাব। ঢাকা ক্লাবের একটু নাম হওয়ার পরে কোলকাতায় আবারও তৈরি করলেন আরেকটি ক্লাব- টাউন ক্লাব। বেশ নিয়মিতভাবেই এই দুটি দলই ব্রিটিশদের আয়োজিত বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিত। পরে সারদারঞ্জনের ক্রিকেটপ্রীতির কারণেই আয়োজন করা হল ডিস্ট্রিক্ট লেভেল ক্রিকেট টুর্নামেন্টের। ইতিমধ্যে কলেজের পড়া শেষ করে প্রেমচাঁদ বৃত্তি পেয়ে ঢাকা কলেজে সারদারঞ্জন সংস্কৃত বিভাগে ভর্তি হলেন। কিন্তু পড়া শেষ করার আগেই অংকের প্রফেসার হিসেবে যোগদান করলেন আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর সেখানে কিছুদিন পড়ানোর পর পাকাপাকিভাবে ফিরে এলেন ঢাকা কলেজে; নিজেই শিক্ষক হিসেবে।  

ঢাকা কলেজে ছাত্রাবস্থায় ক্রিকেটের যে বীজ পুঁতেছিলেন সারদারঞ্জন, সেটাই বৃক্ষ হয়ে উঠল ঢাকা কলেজে শিক্ষক হয়ে ফিরে আসার পর। ১৮৮৪তে ঢাকা কলেজ ক্লাব কোলকাতায় আসে তাদের প্রথম ম্যাচ খেলতে, প্রেসিডেন্সী কলেজের বিরুদ্ধে। ম্যাচটা হয়েছিল আজকের ইডেন গার্ডেন ময়দানেই, যার ফলাফল হিসেবে ঢাকা কলেজ ক্লাব হারিয়েছিল প্রেসিডেন্সীকে কলেজকে। কিন্তু সমস্যাটা হল প্রেসিডেন্সী কলেজ তাদের নিজেদের পরাজয়কে খুব একটা ভালো চোখে দেখল না, যার ফলে তারা সারদারঞ্জন, কুলদারঞ্জন আর প্রমদারঞ্জনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাল। প্রতিবাদের মুখ্য বিষয় ছিল যে নিজেরা ঢাকা কলেজের শিক্ষক হয়ে সারদা, কুলদা ও প্রমদা কিভাবে ঢাকা কলেজ ক্লাবের হয়ে খেলেছে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে প্রেসিডেন্সী কলেজের শিক্ষক মহল ও ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের কাছে চূড়ান্তভাবে অপমানিত হতে হয় রায় পরিবারকে। ফলস্বরূপ সারদারঞ্জন সহ বাকি দুই ভাইও ঢাকা কলেজের শিক্ষকতা ছেড়ে দেন। পরে স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সারদারঞ্জনকে অনুরোধ করে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতার কাজে যুক্ত হতে বলেন। 

কিন্তু অর্থনৈতিক কারণে শেষ অব্দি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট বন্ধ হয়ে গেলে সারদারঞ্জন তাঁর শিক্ষকতার কাজটি হারান। অবশেষে ১৮৯৫তে সারদারঞ্জন কোলকাতায় একটি দোকান শুরু করলেন 'এস রে এন্ড কোম্পানি', মূলত বই ও খেলার সামগ্রীর দোকান। শুধু তাই নয়, কোলকাতার মধ্যে সারদারঞ্জন প্রথম বাঙালী যিনি তার দোকানে একমাত্র বিদেশ থেকে আমদানী খেলার সামগ্রীই রাখতেন এবং চেষ্টা করতেন যাতে যথাসম্ভব কম দামে সেগুলো দেশের মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যায়। মূল্যের দিকে নজর দেওয়া জন্য তিনি যশোর রোডের উপর তার নিজস্ব ফ্যাক্টরি তৈরি করলেন খেলার সামগ্রী তৈরি করার জন্য। ক্রিকেট ব্যাটের জন্য সেইসময় খোদ শিয়ালকোট থেকে উইলো কাঠ আনিয়ে নিজের ফ্যাক্টরিতে তা তৈরি করাতেন সারদারঞ্জন। তার তৈরি 'ব্যালান্স ব্যাট' তখনকার দিনে কোলকাতা ট্রেড ফেয়ারে সেরা পুরস্কারও পেয়েছিল। 

এর পাশাপাশি সারদারঞ্জন নিজেও একজন অসামান্য ক্রিকেট কোচ ছিলেন। তার কোচিং-এ সন্তুষ্ট হয়ে নাটোরের মহারাজাও তাকে তার নিজের ক্রিকেট টিমের কোচ হিসেবে নিযুক্ত করেন। দেখতে শুনতে সারদারঞ্জনের সাথে ডবলু জি গ্রেসের চেহারাগত দিক থেকে মিল থাকার জন্যই নাটোরের মহারাজা তাকে সম্বোধন করতেন 'বাংলার গ্রেস' হিসেবে। কিন্তু শুধু দেখতে শুনতে মিল থাকার জন্য নয়; বরং পরাধীন ভারতে বাঙালীকে ক্রিকেটের সাথে পরিচয় করানোর জন্য, বাংলার ক্রিকেটের প্রতি তার অমূল্য অবদানের জন্যই তাকে বলা হত 'বাংলার গ্রেস'। তাই ইতিহাসে 'প্রথম' হওয়ার উপাধিতে সারদারঞ্জন রায়ের নাম চিরকাল রয়ে যাবে যিনি সামান্য কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা এবং সেখান থেকে পূর্ববঙ্গ হয়ে গোটা ভারত তথা বিশ্বের ক্রিকেটের দরবারে কাছে বাঙালিকে তুলে ধরেছিলেন।   

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...