Skip to main content

ভিয়েতনাম, প্রেসিডেন্ট আর কেলেঙ্কারির গল্প (পর্ব ২)


১৯৬৭-র ১৫ই এপ্রিল নাগাদ সেন্ট্রাল পার্ক থেকে ইউনাইটেড নেশন অব্দি এক বিরাট মিছিল বের করে ‘দ্য মব’; ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে যেখানে হাজার হাজার প্রতিবাদীদের সাথে মিছিলে হেঁটেছিলেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, হ্যারি বেলাফন্ট, জেমস বেভেল, ডঃ বেঞ্জামিন স্পকের মতো মানুষরাও। সেই বছরেরই শেষের দিকে এই কমিটির চেয়ারম্যান ডেভিড ডেলিঞ্জার (“The Trial of Chicago 7”- এই চরিত্রে ছিলেন John Carroll Lynch) সিদ্ধান্ত নেন যে সামনের বছর অর্থাৎ ১৯৬৮-র শিকাগোতে যে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশানাল কনভেনশন হবে, সেখানে সম্মেলনের কাছাকাছি অংশে যুদ্ধ-বিরোধী এক মুক্তমঞ্চ তৈরি করতে হবে, যাতে তাদের প্রতিবাদটা সরাসরি সরকার থেকে জনগণ, পাশাপাশি গোটা বিশ্বের সামনে লাইভ টেলিকাস্ট হয়। ১৯৬৮র প্রথম দিকে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে টেট অফেন্সিভের পরে মার্কিনবাসী ফেব্রুয়ারিতে সংবাদমাধ্যমে শুনল যে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের পরাজয় ঘটেছে। এই ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট জনসন তার নমিনেশনের জন্য ক্যাম্পেইন বন্ধ করে দেন। ফলে ‘দ্য স্প্রিং কমিটি’-র কাছে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার আরো রসদ এসে জমা হতে লাগল ধীরে ধীরে। এরপর শিকাগোয় প্রতিবাদী মঞ্চ গড়ে তোলার জন্য কমিটির পক্ষ থেকে নতুন ডিরেক্টর হিসেবে দুজনকে পাঠানো হয়- টম হেডন (সিনেমায় এই হেডনের ভূমিকায় ছিলেন Eddie Redmayne) আর রেনি ডেভিস (আর রেনির ভূমিকায় ছিলেন Alex Sharp)। ‘দ্য স্প্রিং কমিটি’-র এই ঘোষণার পাশপাশি হিপ্পি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জেরি রুবিন আর অ্যাবি হফম্যান প্রেস কনফারেন্স করে জানান যে ওই একইদিনে তারাও ‘ফেস্টিভ্যাল অফ লাইফ’ বলে একটি কনসার্টের আয়োজন করবেন কনভেনশনের সামনে। তারা জানান যে এই কনসার্টের মুখ্য উদ্দেশ্যই থাকবে সরকারের এই গণতান্ত্রিক সম্মেলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সিনেমায় জেরির ভূমিকায় ছিলেন Jeremy Strong আর অ্যাবির চরিত্রে ছিলেন Sacha Baron Cohen। কিন্তু খুব দ্রুত ১৯৬৮-র এপ্রিলে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের হত্যা আর জুন মাসে রবার্ট কেনেডির হত্যা ঘটনায় নিরাপত্তার কারণে ‘দ্য মব’ আর হিপ্পিদের শিকাগোতে সমস্ত জমায়েতের অনুমতি খারিজ করে দেয় প্রশাসন। রেনি ডেভিস আদালতের কাছে এই খারিজ প্রস্তাব নিয়ে দারস্থ হয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে আদ্যোপান্ত এক শান্তি জমায়েত করতে চাইছেন তারা। কিন্তু অগাস্ট মাসে কনভেনশনের আগে রেনির এই প্রস্তাবও খারিজ করে দেয় আদালত।

‘দ্য মব’ আর হিপ্পিদের জমায়তের খবর পেয়ে আরো কিছু গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত নেয় যে তারাও শিকাগোতে ওইদিন ওইস্থানেই তাদের দাবী নিয়ে প্রতিবাদ সভা গড়ে তুলবে। এর মধ্যে একটি গোষ্ঠী হল ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টি, আর অন্যটি হল সার্দান ক্রিশ্চিয়ান লিডারশিপ কনফারেন্স। এরা ঠিক করে যে প্রত্যেকেই তারা নিজেদের কয়েকজন রিপ্রেসেন্টেটিভকে শিকাগোতে পাঠাবে বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে মঞ্চ গড়ে তুলতে। এদের মধ্যে ববি সিল ছিলেন ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির পক্ষ থেকে। সম্মেলন শুরু হওয়ার তারিখ ছিল সোমবার ২৬শে অগাস্ট, চলবে বৃহস্পতিবার ২৯শে অগাস্ট অব্দি। মোটামুটি সপ্তাহান্ততেই শিকাগোর লিংকন পার্কে প্রতিবাদী জনতাদের তাঁবু পড়তে শুরু করল। সরকারি হিসেব মতে, প্রায় ২০০০ মানুষ উপস্থিত হলেন লিংকন পার্কে। ঠিক সেইদিন রাত ১১টায় শিকাগো প্রশাসন শহরে কার্ফু ঘোষণা করে এবং কোনোরকম বিনা বাধাতেই লিংকন পার্ক খালি করে দেয় পুলিশ। ২৬শে অগাস্টের আগের রাতে শিকাগোতে মোট ১০,০০০ বিক্ষোভকারী এসে পৌঁছায়। অন্যদিকে কনভেনশনের জন্য শিকাগো পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ১১,৯০০ পুলিশকে সহায়তা করতে ৬০০০ ন্যাশানাল গার্ড, ১০০০ এফবিআই ও মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স অফিসার আর ১০০০ সিক্রেট সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টও এসে পৌঁছায় শিকাগোতে। সব মিলিয়ে আগুনে আঁচ টের পেতে শুরু করেছিল সমস্ত পক্ষই। সেই আঁচ কিছুটা পরখ করতেই ২৫শে অগাস্ট রবিবার বিক্ষোভকারীরা তাদের নেতাদের নির্দেশে রাত ১১টার পর আবারও লিংকন পার্কে প্রবেশ করে ফায়ারক্যাম্প, হইহুল্লোড় আর ড্রাম বাজানোর মতো ঘটনা ঘটায়। এরপরেই ২০০ শিকাগো পুলিশ জোর করে, টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে বিক্ষোভকারীদের আবারও পার্ক থেকে বের করে দিতে বাধ্য হয়। পুলিশের যুক্তি ছিল, যেখানে রাত ১১টার পর পার্কে কার্ফু চলছে, সেখানে বিক্ষোভকারীরা আইনকে নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। পরিস্থিতি তখনও হাতের বাইরে চলে যায়নি শিকাগো প্রশাসনের হাত থেকে। সেটা হল পরেরদিন, অর্থাৎ ২৬শে অগাস্ট, সোমবার সকালে।



Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...