প্রায় ১০০ বিক্ষোভকারী ও ১১৯জন পুলিশ সেদিন আহত হয়। সাথে ৬০০ বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে শিকাগো পুলিশ। এদের মধ্যে ‘দ্য মব’-এর হেডন আর ডেভিসও ছিলেন। হিপ্পিদের মধ্যে জেরি রুবিনকে আগেই তুলে নিয়েছিল পুলিশ। অ্যাবি তো তার আগেই জেল কাস্টডিতে। পুলিশের এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান তুলেছিল “The Whole World Is Watching”। আর এই স্লোগানকেই ক্যাপশান করে সেদিন অনেক ন্যাশানাল নিউজ আউটলেট ও ব্রডকাস্ট কোম্পানি এই পুরো বর্বরতাকে গোটা বিশ্বকে দেখিয়েছিল। এই বাক্যটা দিয়ে গুগল বা ইউটিউবে সার্চ করে সেদিনে সেই ব্রডকাস্টের রেকর্ডিং দেখে নিতে পারেন। এই গোটা ঘটনা যেমন একদিকে ঘটছে, ঠিক তখনই অন্যদিকে হামফ্রে প্রেসিডেন্টের নমিনেশনের জন্য বিজয়ী হচ্ছে ইন্টারন্যাশানাল অ্যাম্পিথিয়েটারে।
২৬শে অগাস্ট, ১৯৬৮। সোমবার। শিকাগোর ইলিনয়েসের ৪২ স্ট্রিটের ইন্টারন্যাশানল অ্যাম্পিথিয়েটারে শুরু হয়েছে ১৯৬৮ ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশানাল কনভেনশন। এই সম্মেলনের মধ্যে দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের শাসকদল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তাদের আগামী প্রেসিডেন্ট পদের জন্য মনোনয়ন দেবে। সাথে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করা হবে এই সম্মেলনে। সম্মেলনে উপস্থিত প্রত্যেকেই জানেন যে তাদের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানাতেই প্রায় ১০,০০০ লোক আজ শিকাগোতে জড়ো হয়েছে। এখন শুধু বারুদে আগুন লাগার অপেক্ষা। তবে বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হল না শিকাগোবাসীদের। সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিক্ষোভকারীরা একে একে জড়ো হতে শুরু করেছিল শিকাগোর গ্র্যান্ট পার্কে। এরপর সম্মেলন শুরু হওয়ার কিছুক্ষন্মপরেই হঠাৎই কিছু বিক্ষোভকারী পার্কে বসানো জেনারেল লোগানের মূর্তির উপর উঠে বিক্ষোভ জানাতে শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শিকাগো পুলিশ বিভাগের ঘোড়সওয়ার বাহিনী পাল্টা লাঠি চার্জ করতে শুরু করে পার্কের প্রত্যেক বিক্ষোভকারীদের উপর। পুলিশ কিছুক্ষণের মধ্যে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দিলেও একমাত্র ‘দ্য মব’-দের ২৮ অগাস্ট গ্র্যান্ট পার্কে জমায়েতের জন্য অনুমতি দেয় শিকাগো প্রশাসন। হিপ্পিরা ভেবেছিল যে তারাও 'দ্য মব'-দের দলের সাথে ভিড়ে যাবে গ্র্যান্ট পার্কে। কিন্তু ২৮শে অগাস্ট সকালে হিপ্পিদের অ্যাবি হফম্যান তার নিজের কপালে “F**K” লিখে রাখার জন্য পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। আর সেদিন বিকেলেই ‘দ্য মব’-এর হেডন, ডেলিঞ্জার আর ডেভিস হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্র্যান্ট পার্কে আসার জন্য আমন্ত্রন জানায়। কিন্তু গ্র্যান্ট পার্কে বিক্ষোভকারীদের এই জমায়েতের পর বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী ইন্টারন্যাশানাল অ্যাম্পিথিয়েটারের উদ্দেশ্যে রওনা হয় বিক্ষোভ জানানোর জন্য। তবে বেশিদূর তাদের যেতে হয়নি। কনর্যাড হিল্টন হোটেলের কাছে এসে বিক্ষোভকারীদের রাস্তা আটকায় শিকাগো পুলিশ। কারণ এই হিল্টন হোটেলই ছিল প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডিডেট আর ক্যাম্পেইনের হেডকোয়ার্টারস। সেদিনের সেই ঘটনাকে ‘দ্য গার্ডিয়ান’, ‘শিকাগো সান-টাইমস’-এর মতো সংবাদপত্র বিবরণ দিয়েছিল এইভাবে যে
হিল্টন হোটেলের সামনে পৌঁছানোর পর বিক্ষোভকারী আর পুলিশের মধ্যে খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পুলিশের আক্রমন এতটাই চরমে ওঠে যে তারা সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার কিংবা বিক্ষোভকারী কাউকেই কোনোরকম রেয়াৎ করেনি সেদিন। পুলিশের ছোঁড়া টিয়ার গ্যাস হোটেলের ভেতরে অনেকের ঘরে গিয়েও পড়েছিল। পুলিশ প্রথমে প্লেট গ্লাস দিয়ে বিক্ষোভকারীদের বাধা দেয়। তারপর সেই ভাঙা কাঁচের উপরে রাস্তার উপর ফেলে তাদের উপর লাঠিচার্জ করতে শুরু করে পুলিশ।
এরপর সিটি অফ শিকাগো, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস, হাউস কমিট অন অ্যান-আমেরিকান অ্যাক্টিভিটিস (হুয়াক) এবং ন্যাশানাল কমিশন অন দ্য ক’জ এন্ড প্রিভেনশন অফ ভায়োলেন্স- এই গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করে। তদন্তের প্রথম থেকেই প্রশাসন এই দিকটায় জোর দিতে থাকে যে বিক্ষোভকারীরা বাইরে থেকে শিকাগোতে ঢুকে দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখ নর্থ ডিস্ট্রিক্ট অফ ইলিনয়েসের ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট এক বিশাল জুরিদের নিয়ে এই ঘটনার তদন্ত শুরু করে। ১৯৬৯-এর ২০ই মার্চ এই জুরির দল ৮জন বিক্ষোভকারী ও ৮জন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে তাদের রায়দান করে। এতে ৭জন পুলিশের বিরুদ্ধে জুরিরা জনতার উপর হামলা করার অভিযোগের কথা ঘোষণা করে। অন্যদিকে আটজন বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে দেওয়া জুরিদের রায়ের উপর ভিত্তি করে তাদের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা শুরু হয়। এই আটজন হল- ‘দ্য মব’-এর পক্ষ থেকে ডেভিড ডেলিঞ্জার, রেনি ডেভিস, টম হেডন। হিপ্পিদের থেকে অ্যাবি হফম্যান আর জেরি রুবিন। ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির থেকে ববি সিল; যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ ছিল স্টেট-লাইন লঙ্ঘন করে সরাসরি দাঙ্গাকে উস্কানি দেওয়া। আর শেষ দুজন হল জন ফ্রয়িনেস আর লি ওয়েনার, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তারা বিক্ষোভকারীদের প্রশিক্ষন দিয়েছে যে উত্তেজিত জনতার মধ্যে কিভাবে অগ্নিসংযোগকারী অস্ত্র ব্যাবহার করা যায়। এরা ছাড়াও আরো ষোলোজন বিক্ষোভকারীর নাম উল্লেখ করেছিল জুরিরা, যারা সরাসরি না হলেও এই আটজনকে মদত দেওয়ার কাজে সাহায্য করে গেছে। ট্রায়ালে মূল অভিযুক্ত ছিলেন উপরের এই আটজনই যাদের নিয়ে শুরু হল সেই বিখ্যাত ট্রায়াল, যাকে ভিত্তি করে ২০২০তে তৈরি হল সিনেমা- দ্য ট্রায়াল অফ শিকাগো।




Comments
Post a Comment