‘পেন্টাগন পেপারস’-এর অফিসিয়াল নাম ছিল- রিপোর্ট অফ দ্য অফিস অফ দ্য সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স ভিয়েতনাম টাস ফোর্স। এমন একটা লম্বা চওড়া নামের আড়ালে আসল বিষয়বস্তু ছিল, ১৯৪৫ থেকে ১৯৬৭ অব্দি চলা ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ ডিফেন্সের ইতিহাস যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আর সেনাবাহিনী কতটা জড়িয়ে আছে এই যুদ্ধে। এর থেকে বেশি বিবরণ দিলে আসল লেখার বিষয় হারিয়ে যেতে পারে। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে সাংঘাতিক এক তথ্যের দলিল এই পেন্টাগন পেপারস। কিন্তু হঠাৎ এই দলিলগুলো তৈরির দরকারই বা পড়ল কেন? বরং এ ধরণের প্রামাণ্য দলিলের কোনো অস্তিত্ব না থাকলে সেটা আর এলসবার্গের হাতেও পৌঁছাত না, আবার 'দ্য ওয়াশিং পোস্ট' সেসবের খবর ছাপাতেও পারত না। আসলে ড্যানিয়েলের বস, ডিফেন্স সেক্রেটারি মিঃ রবার্ট ম্যাকনামারা তো জানতেন না যে তার উদ্যোগে তৈরি এই দলিলগুলোই ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মরণ ভোমরা।
“The Post”-এর গল্প আপাতদৃষ্টিতে শিকাগো ট্রায়ালের পরপরেই মনে হলেও এর সূত্রপাত ১৯৬৬তে। আসলে এই ভিয়েতনাম যুদ্ধ, নিক্সন কেলেঙ্কারি- এইসব বিষয়ের ব্যাপারে আমাকে প্রথম যে জানাল, সে Steven Spilberg-এর “The Post”; সত্তরের দশকে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ কাগজের সম্পাদক ব্র্যাডলি (সিনেমায় যে ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন Tom Hanks) আর কাগজের মালিক ক্যাথরিন গ্রাহামের (সিনেমায় গ্রাহামের ভূমিকায় ছিলেন Meryl Streep) যৌথ উদ্যোগে মার্কিন সরকারের যাবতীয় গোপন কেলেঙ্কারির তথ্য রাতারাতি চলে এসেছিল কাগজের প্রথম পাতায়। তবে ওই যে বললাম, এই ঘটনার শুরু আসলে ১৯৬৬ সালে। আর যাকে দিয়ে শুরু, তার নাম ড্যানিয়েল এলসবার্গ; সিনেমায় যার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন Matthew Rhys।
এই ড্যানিয়েল এলসবার্গ তখন চাকরি করতেন আমেরিকার র্যান্ড কর্পোরেশনে, একজন স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্ট হিসেবে। চাকরির পাশাপাশি ১৯৬২তে ড্যানিয়েল হার্ভার্ড থেকে ইকোনমিক্সে পিএইচডিও শেষ করেন। পিএইচডি-তে ড্যানিয়েলের বিষয় ছিল ডিসিশন থিয়োরির উপর যেটি এখন ‘এলসবার্গ প্যারাডক্স’ নামে পরিচিত। পিএইচডি শেষ করার পর ড্যানিয়েল ১৯৬৪তে র্যান্ড কর্পোরেশন ছেড়ে নিযুক্ত হন পেন্টাগনে, অর্থাৎ আমেরিকার স্বরাষ্ট্র বিভাগের মূল দপ্তরে। এখানেই ড্যানিয়েলের বস ছিলেন সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স, রবার্ট ম্যাকনামারা। আসলে ড্যানিয়েলের পেন্টাগনে কাজটা ছিল বিশেষ সরকারী হিসেবে ডিফেন্স ফর ইন্টারন্যাশানাল সিক্যিউরিটি অ্যাফের্স-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জন ম্যাকনটনকে সাহায্য করা। আর এই কাজের জন্য স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন সদস্য হিসেবে জেনারেল এডওয়ার্ড ল্যান্সডেলের কাজের জন্য ড্যানিয়েলকে দুদিনের জন্য পাঠানো হয়েছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামে, যেখান থেকে সে নিজের চোখে দেখে এসেছিল ভিয়েতনামে মার্কিন সৈন্যদের করুণ অবস্থা। আর সেখান থেকে দেশে ফেরার পথেই এক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভেবে বসেন ড্যানিয়েল। দেশে ফিরেই তিনি প্রথমেই পেন্টাগনের চাকরিটা ছেড়ে দেন এবং আবারও ফিরে আসেন র্যান্ড কর্পোরেশনে। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৫, মাত্র এক বছর ড্যানিয়েল কাজ করেছিলেন ম্যাননামারার অধীনে। কাজেই এই গোটা একটা বছর তিনি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের আসল ভূমিকাটা ঠিক কি। তারপর দক্ষিণ ভিয়েতনামে সরাসরি ফিল্ড ভিজিট করার পরেই ড্যানিয়েলের মাথায় আসে ‘পেন্টাগন পেপারস’-এর কথা। আর সেখান থেকেই ঠিক করে নেন যে আবারও তাকে ফিরে আসতে হবে র্যান্ড কর্পোরেশনে। এখানে র্যান্ড কর্পোরেশনের পরিচয়টা একটু দিয়ে রাখি। র্যান্ড কর্পোরেশন হল আদতে আমেরিকার একটি নন-প্রফিটেবল থিংক ট্যাংক বা পলিসি এবং রিসার্চ ইনস্টিটিউট যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার কাজ পরিচালনা করে থাকে। এখন র্যান্ড কর্পোরেশন কিভাবে পেন্টাগনের এমন গোপন তথ্য ফাঁস করে দিল, তার আগে জানা দরকার সেই ‘পেন্টাগন পেপারস’-এ এমন কি গোপন তথ্য ছিল যা জনসমক্ষে আনতে ড্যানিয়েল উঠে পড়ে লাগলেন? তার জন্য একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সেই বিতর্কিত কাগজগুলোতে।



Comments
Post a Comment