Skip to main content

ভিয়েতনাম, প্রেসিডেন্ট আর কেলেঙ্কারির গল্প (পর্ব ৫)

“The Post”-এর গল্প আপাতদৃষ্টিতে শিকাগো ট্রায়ালের পরপরেই মনে হলেও এর সূত্রপাত ১৯৬৬তে। আসলে এই ভিয়েতনাম যুদ্ধ, নিক্সন কেলেঙ্কারি- এইসব বিষয়ের ব্যাপারে আমাকে প্রথম যে জানাল, সে Steven Spilberg-এর “The Post”; সত্তরের দশকে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ কাগজের সম্পাদক ব্র্যাডলি (সিনেমায় যে ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন Tom Hanks) আর কাগজের মালিক ক্যাথরিন গ্রাহামের (সিনেমায় গ্রাহামের ভূমিকায় ছিলেন Meryl Streep) যৌথ উদ্যোগে মার্কিন সরকারের যাবতীয় গোপন কেলেঙ্কারির তথ্য রাতারাতি চলে এসেছিল কাগজের প্রথম পাতায়। তবে ওই যে বললাম, এই ঘটনার শুরু আসলে ১৯৬৬ সালে। আর যাকে দিয়ে শুরু, তার নাম ড্যানিয়েল এলসবার্গ; সিনেমায় যার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন Matthew Rhys।

এই ড্যানিয়েল এলসবার্গ তখন চাকরি করতেন আমেরিকার র‍্যান্ড কর্পোরেশনে, একজন স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্ট হিসেবে। চাকরির পাশাপাশি ১৯৬২তে ড্যানিয়েল হার্ভার্ড থেকে ইকোনমিক্সে পিএইচডিও শেষ করেন। পিএইচডি-তে ড্যানিয়েলের বিষয় ছিল ডিসিশন থিয়োরির উপর যেটি এখন ‘এলসবার্গ প্যারাডক্স’ নামে পরিচিত। পিএইচডি শেষ করার পর ড্যানিয়েল ১৯৬৪তে র‍্যান্ড কর্পোরেশন ছেড়ে নিযুক্ত হন পেন্টাগনে, অর্থাৎ আমেরিকার স্বরাষ্ট্র বিভাগের মূল দপ্তরে। এখানেই ড্যানিয়েলের বস ছিলেন সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স, রবার্ট ম্যাকনামারা। আসলে ড্যানিয়েলের পেন্টাগনে কাজটা ছিল বিশেষ সরকারী হিসেবে ডিফেন্স ফর ইন্টারন্যাশানাল সিক্যিউরিটি অ্যাফের্স-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জন ম্যাকনটনকে সাহায্য করা। আর এই কাজের জন্য স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন সদস্য হিসেবে জেনারেল এডওয়ার্ড ল্যান্সডেলের কাজের জন্য ড্যানিয়েলকে দুদিনের জন্য পাঠানো হয়েছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামে, যেখান থেকে সে নিজের চোখে দেখে এসেছিল ভিয়েতনামে মার্কিন সৈন্যদের করুণ অবস্থা। আর সেখান থেকে দেশে ফেরার পথেই এক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভেবে বসেন ড্যানিয়েল। দেশে ফিরেই তিনি প্রথমেই পেন্টাগনের চাকরিটা ছেড়ে দেন এবং আবারও ফিরে আসেন র‍্যান্ড কর্পোরেশনে। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৫, মাত্র এক বছর ড্যানিয়েল কাজ করেছিলেন ম্যাননামারার অধীনে। কাজেই এই গোটা একটা বছর তিনি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের আসল ভূমিকাটা ঠিক কি। তারপর দক্ষিণ ভিয়েতনামে সরাসরি ফিল্ড ভিজিট করার পরেই ড্যানিয়েলের মাথায় আসে ‘পেন্টাগন পেপারস’-এর কথা। আর সেখান থেকেই ঠিক করে নেন যে আবারও তাকে ফিরে আসতে হবে র‍্যান্ড কর্পোরেশনে। এখানে র‍্যান্ড কর্পোরেশনের পরিচয়টা একটু দিয়ে রাখি। র‍্যান্ড কর্পোরেশন হল আদতে আমেরিকার একটি নন-প্রফিটেবল থিংক ট্যাংক বা পলিসি এবং রিসার্চ ইনস্টিটিউট যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার কাজ পরিচালনা করে থাকে। এখন র‍্যান্ড কর্পোরেশন কিভাবে পেন্টাগনের এমন গোপন তথ্য ফাঁস করে দিল, তার আগে জানা দরকার সেই ‘পেন্টাগন পেপারস’-এ এমন কি গোপন তথ্য ছিল যা জনসমক্ষে আনতে ড্যানিয়েল উঠে পড়ে লাগলেন? তার জন্য একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সেই বিতর্কিত কাগজগুলোতে।

‘পেন্টাগন পেপারস’-এর অফিসিয়াল নাম ছিল- রিপোর্ট অফ দ্য অফিস অফ দ্য সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স ভিয়েতনাম টাস ফোর্স। এমন একটা লম্বা চওড়া নামের আড়ালে আসল বিষয়বস্তু ছিল, ১৯৪৫ থেকে ১৯৬৭ অব্দি চলা ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ ডিফেন্সের ইতিহাস যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আর সেনাবাহিনী কতটা জড়িয়ে আছে এই যুদ্ধে। এর থেকে বেশি বিবরণ দিলে আসল লেখার বিষয় হারিয়ে যেতে পারে। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে সাংঘাতিক এক তথ্যের দলিল এই পেন্টাগন পেপারস। কিন্তু হঠাৎ এই দলিলগুলো তৈরির দরকারই বা পড়ল কেন? বরং এ ধরণের প্রামাণ্য দলিলের কোনো অস্তিত্ব না থাকলে সেটা আর এলসবার্গের হাতেও পৌঁছাত না, আবার 'দ্য ওয়াশিং পোস্ট' সেসবের খবর ছাপাতেও পারত না। আসলে ড্যানিয়েলের বস, ডিফেন্স সেক্রেটারি মিঃ রবার্ট ম্যাকনামারা তো জানতেন না যে তার উদ্যোগে তৈরি এই দলিলগুলোই ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মরণ ভোমরা।

Comments

জনপ্রিয় লেখা

একটি বিবাহের কাহিনী।

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মামণিদেব্যাঃ বিনয়ং নিবেদনম। ২৩ শে অগ্রহায়ণ রবিবার বিধবা কন্যার শুভবিবাহ হইবেক, মহাশয়েরা অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতার অন্তঃপাতী সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে শুভাগমন করিয়া শুভকর্ম করিবেন। ইতি তারিখ ২১ শে অগ্রহায়ণ, শকাব্দঃ ১৭৭৮’। উপরের এই বার্তাটি পড়েই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি বিবাহ নিমন্ত্রন পত্র। যে সে বিবাহ নয়, বিধবা বিবাহ। আজকের এই সময়ে এই বিধবা বিবাহ অসামান্য কোনো কিছু নয়। কিন্তু যদি সময়টা পিছিয়ে ১৮৫৩ সালে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে কিন্তু এই নিমন্ত্রন পত্র এক সাংঘাতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষত যখন সেই বার্তা ডাকে এবং হাতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আটশো জনের কাছে এসে পৌঁছেছে। বার্তার প্রেরক যেখানে একজন ব্রাহ্মন পণ্ডিত, সেখানে চমকে ওঠারই কথা। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগর দিনরাত ভেবে চলেছেন কিভাবে বাংলাদেশে বিধবা মেয়েদের কল্যানের কথা ভাবা যায়। বিধবাদের মনোবেদনার সপক্ষে শাস্ত্রীয় সাক্ষ্য পেয়ে বিদ্যাসাগর পেশ করলেন শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেবের বিবেচনা সভায়। প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তর্কে জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। রাধাকান্ত দেব একজোড়া মূল্যবান শাল দিয়ে পুরস্কৃত করলেন তাকে। কিন্তু...

প্রথম বাঙালি যাদুকর।

‘বাঙালি যাদুকর’ বলতেই বাঙালিরা আমরা সকলে একবাক্যে পি সি সরকারের নামটাই নি; সে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র যে কেউই হোক। কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, এই পি সি সরকারেরও বহু বছর আগে খোদ কোলকাতাতেই প্রথম বাঙালি যাদুকর হিসেবে নাম করেছিলেন তিনি। পি সি সরকার সিনিয়ারের ‘সিনিয়র’ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা ছিলেন এই বাঙালি যাদুকর; গণপতি চক্রবর্তী। বাঙালিদের কাছে গণপতি চক্রবর্তী এখন ধুলোয় মিশে যাওয়া একটি নাম। গণপতি ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী জমিদার পুত্র। ছোট থেকেই পড়াশুনা ছাড়া গানবাজনাতে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু বাবার সাথে জমিদারি চালানোর দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন গণপতি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলার বাইরে নানা অঞ্চলের সাধু-তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঘুরতে লাগলেন গণপতি। শিখতে লাগলেন তাদের থেকে ভারতবর্ষের আদি যাদুবিদ্যা, সহজ ভাষায় যা কিনা ‘ভানুমতীর খেল’। কিন্তু এইভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাতে কিছুকাল পরে আর্থিক  সমস্যায় পড়তে হল তাকে। তাই সোজা চলে এলেন কোলকাতা। কোলকাতায় তখন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস শুধু বাংলা নয়, তখনকার দিনে গোটা ভারতবর্ষের গর্ব। বাংলাদেশের গুটিকয়েক বঙ্গসন্তানদের নিয়ে ...

বাঙালির হুজুকে কলকাতা।

বাঙালি আর কলকাতা; ইদানিং এই দুটো জিনিসে ‘হুজুক’ শব্দটা পেট্রলিয়াম পন্যের দামের মতোই বেড়ে চলেছে। হুজুকটা সে কিছু পন্যের কাল্পনিক চরিত্র নিয়েই হোক বা অন্যকে সাহসিকতা স্বরূপ কিছু চ্যালেঞ্জ করা নিয়েই হোক, বাঙালি যতদিন আছে এই হুজুকও ততদিন আছে। অবশ্য এই প্রজন্মের কলকাতা কিংবা বাঙালিকে এই হুজুক নিয়ে দোষারোপ করা যায় না। কেন না, কলকাতা যবে থেকে আছে, এই হুজুকও তবে থেকেই আছে। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ যারা পড়েছেন তারা কিছুটা জানেন এ ব্যাপারে। হুতোমের জবানবন্দী থেকেই কিছু তুলে ধরি। হুতোম এই শহরকে বলতেন ‘হুজুকে কলকেতা’। সব হুজুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর হুজুক নিয়ে বলা যাক, সেটা হল ‘জাল প্রতাপচাঁদ’-এর কথা। এও এক হুজুক উঠেছিল শহরে ১৮৩৫ সালে। প্রতাপচাঁদ ছিলেন বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ রায়ের একমাত্র পুত্র। প্রতাপ যৌবন থেকেই ছিলেন উৎশৃঙ্খল ও মদ্যপ। এদিকে তেজচাঁদের পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর ভাই পরানচাঁদ, যিনি ছিলেন রাজ এস্টেটের দেওয়ান; দুজনেই উত্তরাধিকারী প্রতাপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন রাজ-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অত্যধিক ব্যাভিচারের জন্য প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হলে তাকে কালনায় নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গাযাত্র...